খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeমেডিকেল জার্নালঅটিজম কেন হয়? অটিজমের কারণ, ঝুঁকি ও আধুনিক বিজ্ঞান যা বলছে

অটিজম কেন হয়? অটিজমের কারণ, ঝুঁকি ও আধুনিক বিজ্ঞান যা বলছে

বিভিন্ন গবেষণায় অটিজমের Heritability Estimate প্রায় ৭৫ থেকে ৯২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তবে এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে, কোনো শিশুর অটিজম হওয়া শতভাগ জিন দ্বারা নির্ধারিত।

আজকের গবেষণা বলছে, অটিজম কোনো রহস্যময় রোগ নয়, আবার এটি কোনো একক কারণেও সৃষ্টি হয় না। বরং শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে জিন, পরিবেশ এবং জীববৈজ্ঞানিক নানা প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবই অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের (ASD) সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অটিজম নিয়ে ভয় বা ভুল ধারণা নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) হলো একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থা, যা একজন মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ, ভাষা, আচরণ এবং সংবেদনশীলতার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয় এবং কারও ভুলের ফলও নয়।

একটি শিশুর জন্মের বহু আগে, মায়ের গর্ভেই তার মস্তিষ্কের জটিল বিকাশ শুরু হয়। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি হয় এবং তাদের মধ্যে অসংখ্য সংযোগ গড়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় যদি জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত প্রভাব এবং জীববৈজ্ঞানিক পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে শিশুর মস্তিষ্ক অন্যদের তুলনায় ভিন্নভাবে বিকশিত হতে পারে। এই ভিন্নতার একটি রূপই হলো অটিজম।

১৯৪৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. লিও ক্যানার প্রথম অটিজমকে একটি স্বতন্ত্র নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে অটিজম নিয়ে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল।

এক সময় মনে করা হতো, মায়ের স্নেহের অভাব বা সন্তানের প্রতি শীতল আচরণের কারণে অটিজম হয়। পরে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়।

এরপর আরেকটি বড় বিতর্ক শুরু হয় এমএমআর (MMR) টিকা নিয়ে। একটি ছোট গবেষণায় টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্কের দাবি করা হলেও, পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ শিশুর ওপর পরিচালিত গবেষণায় সেই দাবি সমর্থন পায়নি। শেষ পর্যন্ত সেই গবেষণা প্রত্যাহার করা হয় এবং বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো একমত—টিকা অটিজম সৃষ্টি করে না।

এই ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—বিজ্ঞান নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে নিজের ভুল সংশোধন করতে পারে।

গত কয়েক দশকে যমজ শিশু এবং পরিবারের ওপর পরিচালিত অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, অটিজমের ক্ষেত্রে জিনগত প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিভিন্ন গবেষণায় অটিজমের Heritability Estimate প্রায় ৭৫ থেকে ৯২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তবে এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে, কোনো শিশুর অটিজম হওয়া শতভাগ জিন দ্বারা নির্ধারিত।

এর প্রকৃত অর্থ হলো, একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অটিজমের পার্থক্যের বেশিরভাগ অংশ জিনগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অটিজমের জন্য কোনো একক “অটিজম জিন” নেই। বরং শত শত জিন একসঙ্গে মস্তিষ্কের বিকাশে ভূমিকা রাখে। তাই বর্তমানে বিজ্ঞানীরা অটিজমকে Polygenic Neurodevelopmental Condition হিসেবে বিবেচনা করেন।

যদি জিনই একমাত্র কারণ হতো, তাহলে অভিন্ন যমজ দুই শিশুরই সবসময় একইভাবে অটিজম হওয়ার কথা। বাস্তবে এমনটি সব ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এ থেকেই বোঝা যায়, পরিবেশগত উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পরিবেশগত উপাদানগুলো ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু এগুলো এককভাবে অটিজমের কারণ নয়।

গর্ভাবস্থায় কোন বিষয়গুলো ঝুঁকি বাড়াতে পারে?

ভ্যালপ্রোইক অ্যাসিড (Valproic Acid)

মৃগী ও কিছু স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই ওষুধ গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে ব্যবহার করলে কিছু নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বাড়তে পারে।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। এতে মা ও শিশুর জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রথম ট্রাইমেস্টারে গুরুতর সংক্রমণের সময় মায়ের শরীরে তৈরি হওয়া প্রদাহজনিত রাসায়নিক পদার্থ বা সাইটোকাইন ভ্রূণের বিকাশমান মস্তিষ্ককে কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবিত করতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গর্ভাবস্থার শেষ দিকে অতিক্ষুদ্র দূষণকণা, বিশেষ করে PM2.5, প্লাসেন্টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

গবেষণায় আরও যেসব বিষয়ে সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • SSRIs জাতীয় কিছু ওষুধ
  • ভারী ধাতুর সংস্পর্শ
  • কীটনাশকের অতিরিক্ত প্রভাব
  • বাবার বেশি বয়সে সন্তান নেওয়া
  • গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
  • মাতৃস্থূলতা

তবে এগুলোর কোনোটিকেই এককভাবে অটিজমের কারণ বলা যায় না।

আধুনিক গবেষণা বলছে, জিন এবং পরিবেশ আলাদা নয়; বরং তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করে।

জিন শিশুর মস্তিষ্কের প্রাথমিক নকশা তৈরি করে। এরপর গর্ভকালীন পরিবেশ, পুষ্টি, সংক্রমণসহ বিভিন্ন বিষয় সেই জিনগুলোর কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এপিজেনেটিক্স (Epigenetics)।

এপিজেনেটিক পরিবর্তন নির্ধারণ করে কোন জিন কখন সক্রিয় হবে এবং কতটা কাজ করবে। ফলে মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভাষা, সামাজিক যোগাযোগ এবং সংবেদনশীলতার বিকাশ একেকজনের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।

অটিজমকে “স্পেকট্রাম” বলা হয় কারণ এর প্রকাশ সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়।

কেউ খুব ভালোভাবে কথা বলতে পারেন, আবার কারও ভাষা বিকাশে বিলম্ব হতে পারে। কেউ গণিত বা সংগীতে অসাধারণ দক্ষ হতে পারেন, আবার কেউ দৈনন্দিন কাজেও সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণেই বিশেষজ্ঞদের একটি বহুল পরিচিত বক্তব্য হলো—

If you’ve met one person with autism, you’ve met one person with autism.

অর্থাৎ, একজন অটিস্টিক ব্যক্তিকে দেখে অন্য সবার সম্পর্কে ধারণা করা ঠিক নয়।

আজও সমাজে অটিজম নিয়ে অনেক ভুল বিশ্বাস রয়েছে। যেমন—

  • অটিজম খারাপ লালন-পালনের ফল।
  • টিকা দিলে অটিজম হয়।
  • অটিজম একটি মানসিক রোগ।
  • অটিস্টিক শিশু কখনো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না।

বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা এসব ধারণাকে সমর্থন করে না। অটিজম মূলত মস্তিষ্কের বিকাশজনিত একটি বৈচিত্র্য, যা ব্যক্তি ভেদে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।

অটিজম যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ শুরু করা সম্ভব।

স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, বিশেষ শিক্ষা এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা শিশুর যোগাযোগ দক্ষতা, সামাজিক আচরণ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিটি শিশুর চাহিদা আলাদা হওয়ায় চিকিৎসা ও সহায়তার পরিকল্পনাও ব্যক্তিভেদে নির্ধারণ করা উচিত।

অটিজম কোনো একক কারণের ফল নয়। এটি জিন, পরিবেশ, এপিজেনেটিক পরিবর্তন এবং মস্তিষ্কের বিকাশের জটিল সমন্বয়ের একটি অংশ। তাই অটিজম নিয়ে ভয়, কুসংস্কার বা দোষারোপের পরিবর্তে আমাদের উচিত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর আস্থা রাখা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অটিজম কোনো শিশুর পরিচয় নয়; এটি তার স্নায়ুবিক বৈচিত্র্যের একটি অংশ মাত্র। প্রতিটি শিশুর নিজস্ব শক্তি, প্রতিভা এবং সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ, উপযুক্ত সহায়তা, পরিবার ও সমাজের গ্রহণযোগ্যতা এবং সহমর্মিতাই তাদের বিকাশের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হতে পারে।