বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ দলটির অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, জামায়াত মুখে ইসলাম ও শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বললেও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইসলামী সমাজ বা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নামের সঙ্গে ইসলাম থাকলেও বাস্তবে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইসলামের প্রতিফলন স্পষ্ট নয়। তিনি সংসদে দলটির নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরে দাবি করেন, সেখানে কোথাও শরিয়া আইন, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইসলামী সমাজ বা ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি উল্লেখ নেই।
তার ভাষায়, একটি রাজনৈতিক দলের নামের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় থাকলেই তা ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং তাদের নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনাই প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরে।
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, জামায়াতের শিক্ষা নীতিতে মূলত মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। অথচ দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না দেয়, তাহলে তাদের জাতীয় উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে।
ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী। তবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সময়ও দলটি সেই প্রক্রিয়ার পক্ষে ছিল না। একইভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের ভেতরে পাকিস্তানি শাসকদের সহযোগী হিসেবে কিছু জামায়াত নেতার ভূমিকা ছিল। গভর্নর মালেক সরকারের মন্ত্রিসভায় তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সংসদে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
তার মতে, স্বাধীনতার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ পেয়ে ১৯৭৯ সালে দলটি আবার সংগঠিত হয় এবং সময়ে সময়েই রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী জোট পরিবর্তন করেছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়নি; বরং আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন থানায় মামলা রেকর্ড করতে কোনো রাজনৈতিক নির্দেশনা বা সুপারিশের প্রয়োজন হয় না। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
মন্ত্রী কুমিল্লার নিখোঁজ জিশান, চট্টগ্রামের শিশু ফারিয়া এবং রামিসা হত্যার মতো আলোচিত ঘটনাগুলোর উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় পুলিশ দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে এবং চার্জশিটও দাখিল করেছে।
তার মতে, এটি প্রমাণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম আগের তুলনায় আরও সক্রিয় ও গতিশীল হয়েছে।
সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে আধুনিক এবং সময়োপযোগী আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে তরুণ সমাজকে অপরাধ ও নেশা থেকে দূরে রাখা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজেট নিয়ে ঋণনির্ভরতার সমালোচনা করা হলেও বাস্তবতা হলো বিশ্বের প্রায় সব দেশই উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাংক বা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করে।
সরকার রাজস্ব ব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর দিকেই জোর দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী জানান, তিস্তা প্রকল্প এবং পদ্মা ব্যারেজ এর মতো বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তার মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের কৃষি, সেচ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।
সংসদে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস-এর শেয়ার বিক্রি নিয়ে ওঠা বিতর্কেরও জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। তার দাবি, এটি রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছিল এবং এর পক্ষে তার কাছে অডিট রিপোর্টসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।
একইসঙ্গে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের বিপুল পরিমাণ শেয়ার নামমাত্র মূল্যে বিক্রির দলিলও তার হাতে রয়েছে বলে সংসদে উল্লেখ করেন।


