২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে আসছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে ব্যবসা, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সাধারণ করদাতাদের ওপর। করপোরেট কর হ্রাস, ব্যাংক হিসাব খোলায় ই-টিআইএন বাধ্যবাধকতা বাতিল, স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স কমানো এবং করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তগুলো অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
চূড়ান্ত বাজেটে শর্তসাপেক্ষে করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ পর্যন্ত কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে এই সুবিধা ছিল না, তবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মনে করছে, করপোরেট কর কমলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, শিল্প উৎপাদনে গতি আসবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার পথও সহজ হবে।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের করহার ২২.৫ শতাংশ। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। নতুন বাজেটে কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার আরও কমিয়ে ২২.৫ শতাংশ নির্ধারণের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৩৭.৫ শতাংশ এবং তালিকাবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪০ শতাংশ বহাল থাকছে। মোবাইল অপারেটর, তামাক কোম্পানি এবং অন্যান্য বিশেষ খাতেও আগের করহার কার্যকর থাকবে।
ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এটি জটিলতা তৈরি করতে পারত।
এখন সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে আসছে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএন সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকিং সেবায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তা ও তরুণদের জন্য এটি বড় স্বস্তি।
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বর্ণ বিক্রির ওপর ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত বাজেটে এই হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার চিন্তা করা হচ্ছে।
এর অর্থ, করদাতা যদি আয়কর নথিতে ঘোষিত স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রি করেন, তাহলে মুনাফার ওপর মাত্র ৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
এনবিআরের মতে, অনেকেই কর ফাইলে অতিরিক্ত স্বর্ণ দেখিয়ে অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার চেষ্টা করেন। নতুন এই করনীতির মাধ্যমে সেই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
উদাহরণ হিসেবে, যদি কেউ ১০ বছর আগে ৫ লাখ টাকায় স্বর্ণ কিনে থাকেন এবং এখন তা ৮ লাখ টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে ৩ লাখ টাকার মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
শিক্ষাখাতে বড় স্বস্তি হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের করহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকার মনে করছে, কর কমালে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পরিবেশ উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমবে।
বর্তমানে দেশে University Grants Commission অনুমোদিত ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে চালু আছে ১০৩টি। এছাড়া রয়েছে ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ২৬টি ডেন্টাল কলেজ এবং ২০টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।
সাধারণ করদাতাদের জন্য বড় সুখবর হলো করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। বর্তমানে এই সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থাকলেও নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে।
এছাড়া আগামী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে এটি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এনবিআর সূত্র অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এই সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসবে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ছোট ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, এতে ব্যবসার খরচ বাড়বে এবং পণ্যের দামও বেড়ে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার আপাতত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে। ফলে ছোট ব্যবসায়ী ও খুচরা বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
শেয়ারবাজারের স্বার্থে লভ্যাংশ আয়ের ওপর করহার ২০ শতাংশ বহাল রাখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এটি পরিবর্তনের চিন্তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় আগের হারই রাখা হচ্ছে।
এতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, করপোরেট কর কমানো ও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ফলে বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় দুটোই বাড়তে পারে। ব্যাংক হিসাব খুলতে সহজ শর্ত সাধারণ মানুষকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত করবে।
অন্যদিকে স্বর্ণের গেইন ট্যাক্স কমানো কর ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর কমলে শিক্ষার খরচেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে করনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ করদাতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।


