দেশজুড়ে শুরু হয়েছে জাতীয় ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইন-২০২৬। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, রাতকানা রোগ প্রতিরোধ এবং অন্ধত্বের ঝুঁকি কমাতে সরকার আবারও বড় পরিসরে এই কর্মসূচি চালু করেছে। রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে একযোগে পরিচালিত হচ্ছে এই বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। এবারের ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ ৩৬ হাজার শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভিটামিন শিশুর চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে।
সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে অপুষ্টি ও ভিটামিনের ঘাটতি থেকে সৃষ্ট নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের এই সেবার আওতায় আনা হচ্ছে।
জাতীয় এই কর্মসূচির আওতায় দুই ধাপে শিশুদের ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছে।
৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের দেওয়া হবে একটি নীল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল।
অন্যদিকে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের খাওয়ানো হবে একটি লাল রঙের উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল।
এই বয়সভিত্তিক ডোজ নির্ধারণ করা হয়েছে শিশুদের শারীরিক চাহিদা ও নিরাপত্তা বিবেচনায়।
সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার স্থায়ী কেন্দ্র** এবং প্রায় ৫০০ অস্থায়ী কেন্দ্র** খোলা হয়েছে। এসব অস্থায়ী কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন এবং ফেরিঘাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
এতে যেসব পরিবার যাতায়াতের মধ্যে থাকবেন, তারাও সহজেই শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়াতে পারবেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন যাতে প্রতিটি শিশু সঠিকভাবে সেবা পায়।
অনেক সময় নানা কারণে অভিভাবকরা নির্ধারিত দিনে শিশুদের নিয়ে কেন্দ্রে যেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, যদি কোনো শিশু নির্ধারিত দিনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিতে না পারে, তাহলে পরদিন সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে ক্যাপসুল গ্রহণ করা যাবে।
এছাড়া দেশের ১২ জেলার ৫৮টি দুর্গম উপজেলায় আরও চার দিন বিশেষ ক্যাম্পেইন চলবে, যাতে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরাও বাদ না পড়ে।
ভিটামিন ‘এ’ শুধু চোখের জন্য নয়, পুরো শরীরের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় এবং সুস্থ বিকাশে সহায়তা করে।
চিকিৎসকরা বলেন, যেসব শিশু নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ পায় না, তাদের মধ্যে রাতকানা রোগ, অপুষ্টি এবং গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
এই কারণে সরকার নিয়মিত বিরতিতে এই ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে আসছে।
বাংলাদেশে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। তখন এটি “জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম” নামে পরিচিত ছিল।
পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে এটি সংযুক্ত করা হয়, যাতে আরও বেশি শিশুর কাছে সেবা পৌঁছানো যায়।
২০০৩ সালে এটি আলাদা কর্মসূচি হিসেবে চালু হয় এবং নাম দেওয়া হয় “জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন”।
এরপর ২০১১ সাল থেকে জাতীয় পুষ্টিসেবা (এনএনএস) অপারেশন প্ল্যানের অধীনে কার্যক্রম চলতে থাকে। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এটি পরিচালিত হওয়ার পর সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। ২০২৬ সালে আবার নতুন করে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের অনুরোধ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিকটস্থ কেন্দ্রে গিয়ে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে।
একটি ছোট উদ্যোগ আপনার শিশুকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই কোনোভাবেই এই সুযোগ হাতছাড়া না করার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জাতীয় ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইনকে সফল করতে সবার অংশগ্রহণ জরুরি।


