স্ট্রেস বা মানসিক চাপ আজকের ব্যস্ত জীবনের নিত্যসঙ্গী। কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব—সবকিছু মিলিয়ে শরীরে বাড়তে থাকে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে একটি অদ্ভুত দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বলা হচ্ছে, মাত্র ৪০ সেকেন্ড জিভ বাইরে বের করে রাখলেই নাকি কর্টিসলের মাত্রা কমে যায় এবং মানসিক চাপও হ্রাস পায়। কিন্তু এই দাবির আদৌ কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে কি? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এ বিষয়ে কী বলছেন? চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
কর্টিসল কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কর্টিসলকে সাধারণত স্ট্রেস হরমোন বলা হয়। তবে এটি শুধু মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনায় এই হরমোন অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
কর্টিসল শরীরের ঘুম-জাগরণের স্বাভাবিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করে, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, বিপাকক্রিয়া সচল রাখে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, সুস্থভাবে শরীর পরিচালনার জন্য কর্টিসলের সঠিক ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মানসিক বা শারীরিক চাপের মধ্যে থাকলে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তখন শরীরে একাধিক নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে শুরু করে।
৪০ সেকেন্ড জিভ বার করে রাখলে কি সত্যিই কমে কর্টিসল?
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের এক স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দাবি করেছেন, প্রতিদিন নিয়ম করে প্রায় ৪০ সেকেন্ড জিভ বাইরে বের করে রাখলে কর্টিসলের মাত্রা কমতে পারে। তাঁর মতে, এই ভঙ্গিতে মুখ ও গলার কিছু পেশির ব্যায়াম হয়, যা শরীরকে কিছুটা শিথিল করে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তিনি একজন রোগীর ক্ষেত্রে এমন ফল পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।
এই বক্তব্য সমাজমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অনেকেই এটিকে সহজ এবং দ্রুত স্ট্রেস কমানোর কৌশল হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেন।
ভারতীয় চিকিৎসকদের মত কী?
তবে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এই দাবিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত বলে মনে করছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র জিভ বাইরে বের করে রাখলেই কর্টিসল কমে যায়—এমন কোনও স্বীকৃত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও প্রকাশিত হয়নি। তাই এটিকে নিশ্চিতভাবে কার্যকর পদ্ধতি বলা যায় না।
চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি এই ভঙ্গিতে মুখ ও গলার পেশি কিছুটা আরাম পায়, তাহলে সাময়িকভাবে শরীরের চাপ কিছুটা কম অনুভূত হতে পারে। আর মানসিক চাপ কমলে পরোক্ষভাবে কর্টিসলের মাত্রাও সামান্য কমতে পারে। তবে এটি সরাসরি কর্টিসল কমানোর নির্ভরযোগ্য উপায় নয়।
সিংহাসন যোগাসনের সঙ্গে কি কোনও মিল রয়েছে?
অনেকেই এই কৌশলের সঙ্গে সিংহাসন যোগাসনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন।
সিংহাসন একটি পরিচিত যোগাসন, যেখানে বজ্রাসনে বসে জিভ সম্পূর্ণ বাইরে বের করতে হয়। একই সঙ্গে বিশেষ ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শব্দ উচ্চারণের অনুশীলন করা হয়।
যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আসন মুখ, গলা ও চোয়ালের পেশিকে সক্রিয় করে। পাশাপাশি মনকে কিছুটা শান্ত করতেও সাহায্য করতে পারে।
তবে চিকিৎসকদের মতে, সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া পদ্ধতিটি সিংহাসনের সম্পূর্ণ অনুশীলন নয়। কিছুটা মিল থাকলেও দুটি এক নয়।
কর্টিসল বেড়ে গেলে কী সমস্যা হতে পারে?
দীর্ঘ সময় ধরে কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া
- ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলত্ব
- ঘুমের সমস্যা
- উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া
- দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
এ ছাড়া অতিরিক্ত কর্টিসল শরীরে সুখানুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত ডোপামিনের মাত্রাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মন খারাপ, ক্লান্তি ও উদ্যমহীনতা বাড়তে পারে।
কর্টিসল কমানোর বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত উপায়
চিকিৎসকদের মতে, কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোনও ম্যাজিক কৌশলের প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে কার্যকর।
১. পর্যাপ্ত ঘুম
প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো মানের ঘুম কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২. পুষ্টিকর খাবার
খাদ্যতালিকায় রাখুন—
- বিভিন্ন ধরনের ফল
- শাকসবজি
- বাদাম
- সামুদ্রিক মাছ
- লেবুজাতীয় ফল
- পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার
এসব খাবার শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৩. নিয়মিত শরীরচর্চা
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা সাইকেল চালানোর মতো শারীরিক কার্যকলাপ মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর।
৪. যোগব্যায়াম ও প্রাণায়াম
নিয়মিত যোগব্যায়াম এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম স্নায়ুকে শান্ত রাখে এবং স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।
৫. নিজের জন্য সময় রাখুন
শখের কাজ করুন, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান, প্রয়োজন হলে কিছু সময় মোবাইল বা সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে থাকুন। এসব ছোট অভ্যাসও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
ভাইরাল স্বাস্থ্য-পরামর্শ মানার আগে কী করবেন?
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য স্বাস্থ্য-পরামর্শ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব তথ্যই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়।
তাই কোনও নতুন কৌশল অনুসরণ করার আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যদি দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনও স্বাস্থ্যসমস্যা থাকে, তাহলে নিজে নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
মাত্র ৪০ সেকেন্ড জিভ বাইরে বের করে রাখলে কর্টিসল কমে যায়—এমন দাবির পক্ষে এখনও শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যদিও মুখ ও গলার পেশি কিছুটা শিথিল হওয়ার কারণে সাময়িকভাবে আরাম অনুভূত হতে পারে, তবু এটিকে স্ট্রেস কমানোর নিশ্চিত চিকিৎসা বলা যাবে না।
কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সচেতন জীবনযাপন। দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে এ ধরনের অভ্যাসই সবচেয়ে বেশি উপকার করে।


