খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeঅর্থ-বানিজ্যজ্বালানি সংকটে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাংকের ১.১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা!

জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাংকের ১.১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা!

দেশের কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন সচল রাখা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে World Bank। সংস্থাটি বাংলাদেশকে জরুরি সহায়তা হিসেবে প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। এই সহায়তা দেশের কৃষি, খাদ্য ও জীবিকা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বব্যাপী খাদ্য, সার ও জ্বালানির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস জানিয়েছে, সার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের ক্ষুদ্র কৃষক, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই জরুরি ভিত্তিতে এই অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই অর্থায়নের বড় একটি অংশ ব্যয় হবে ‘ইমার্জেন্সি সাপোর্ট ফর ফুড সিকিউরিটি প্রজেক্ট’-এর আওতায়। মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমন মৌসুম এবং ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার আমদানি করা হবে।

বাংলাদেশের মোট সারের চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের কৃষি উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলে।

বিশ্বব্যাংকের এই সহায়তায় প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন গুরুত্বপূর্ণ সার আমদানি করা হবে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই থাকবে ইউরিয়া সার, যা ধান উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই সার সরবরাহের ফলে দেশের প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর জমিতে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকরা এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। কারণ তাদের অনেকেই বাজারদরের উচ্চমূল্যে সার কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো সার না পেলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা সরাসরি খাদ্য ঘাটতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ Sulemane Coulibaly জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আমন ও বোরো মৌসুম থেকে।

দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তাই এই দুই মৌসুমে সারের ঘাটতি তৈরি হলে তা শুধু খাদ্য উৎপাদনেই নয়, কর্মসংস্থান, আয় এবং দারিদ্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই বাস্তবতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নকে কৃষি খাতের জন্য সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জরুরি তহবিলের আরেকটি অংশ ‘কনটিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রজেক্ট’-এর আওতায় দ্রুত ছাড় করা হবে।

এই তহবিলের বড় অংশ ব্যয় হবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দিতে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য থাকবে পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধার কর্মসূচি।

এতে ব্যবসায়িক ক্ষতি সামলে দাঁড়াতে পারবেন অনেক উদ্যোক্তা, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই অর্থের একটি অংশ খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ এবং পানি সরবরাহের মতো জরুরি সেবা সচল রাখতে ব্যবহার করা হবে।

বিশেষ করে জ্বালানি খাতে এই অর্থের ব্যবহার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। কারণ জ্বালানি সংকট তৈরি হলে তা পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সরকারি সূত্র বলছে, চলতি মাসের ৩০ জুনের মধ্যেই এই অর্থ ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ Leslie Jean Yu Cordero জানিয়েছেন, বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর অব্যবহৃত অর্থ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই জরুরি তহবিল তৈরি করা হয়েছে।

এর ফলে নতুন কোনো দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যেতে হচ্ছে না। দ্রুত অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সহায়তা পাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

একদিকে কৃষি উৎপাদন সচল থাকবে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিক সহায়তা পাবেন। ফলে দেশের বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।

সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের এই ১১০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি, খাদ্য এবং জীবিকা সুরক্ষায় এটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।