দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাড়ানোর দাবি আবারও জোরালোভাবে উঠেছে জাতীয় সংসদে। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় তাদের ভাতায় অন্তত প্রতীকী হলেও বৃদ্ধি আনা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৫তম দিনে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবি জানান। সংসদে দেওয়া তার বক্তব্যে উঠে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা, জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারদের সহায়তা এবং দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করছে। তবে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী দীর্ঘদিন ধরে ২০ হাজার টাকায় স্থির রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীকদের ভাতা ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতায় কোনো পরিবর্তন না আসায় তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
তার ভাষায়, “এক টাকা হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাড়ানো উচিত। কারণ এটি শুধু অর্থের বিষয় নয়, এটি সম্মান ও স্বীকৃতির প্রশ্ন।”
বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া আহতদের জন্য বিভিন্ন শ্রেণিভেদে ২০ হাজার, ১৫ হাজার এবং ১০ হাজার টাকা ভাতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি জুলাই যোদ্ধাদের অবদানকে খাটো করছেন না। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সঙ্গে অন্য কোনো ভাতার তুলনা করা ঠিক হবে না।
তার মতে, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মূল্য দেশের স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই তাদের সম্মান আলাদা মাত্রায় বিবেচনা করা উচিত।
ফজলুর রহমান বলেন, দেশের অনেক রাজনৈতিক দল নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু সেই পরিচয়ের বাস্তব প্রতিফলন তখনই হবে, যখন মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে যারা জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে মনে করেন, তাদের উচিত মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও সম্মানের প্রশ্নে আরও বেশি সচেতন হওয়া।
বাজেট আলোচনায় তিনি দেশের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিরও কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ধর্মকে ব্যবহার করে সমাজে বিভেদ তৈরির চেষ্টা চলছে, যা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
পলাশবাড়ীতে রাম মন্দির নির্মাণ নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হিন্দুরা যদি মন্দির নির্মাণ করে, আর মুসলমানরা মসজিদ নির্মাণ করে—সেখানে সমস্যা কোথায়?
তার বক্তব্যে উঠে আসে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা। তিনি বলেন, “তারা মন্দিরে পূজা করবে, আমরা মসজিদে নামাজ পড়ব। এটাই তো সহাবস্থান।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও বাংলাদেশের সমান নাগরিক। তাদের এই দেশে বসবাসের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, “আমরা কি একসঙ্গে থাকতে পারব না?”
তার এই বক্তব্য সংসদে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
বাংলার ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, খাজা মইনুদ্দিন চিশতী, খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া, শাহজালাল, শাহপরান, বায়েজিদ বোস্তামী এবং খান জাহান আলী-এর মতো অলি-আউলিয়ারা মানবতার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন।
তাদের শিক্ষা ছিল—মানুষের মর্যাদা সবার আগে।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু গোষ্ঠী এখন সেই সুফি ঐতিহ্যকেও অস্বীকার করছে এবং মাজার সংস্কৃতির বিরোধিতা করছে। যা দেশের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।


