বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দিল ইকুয়েডর। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে শুধু চমকই দেখায়নি, ইতিহাসও গড়েছে লাতিন আমেরিকার দলটি। এই জয়ের সুবাদে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটে জায়গা নিশ্চিত করেছে ইকুয়েডর। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠল দেশটি।
ম্যাচ শেষে আবেগে ভেসে যান ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেস। দলের ঐতিহাসিক সাফল্যের আনন্দ ভাগ করে নিতে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এখন উদযাপনের সময়। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিন। চাইলে এক গ্লাস বিয়ার পান করুন। এটি বিশ্বকাপে ইকুয়েডরের সবচেয়ে বড় জয়।”
ম্যাচের শুরুটা ছিল পুরোপুরি জার্মানির দখলে। খেলা শুরুর মাত্র ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের মাথায় ফ্লোরিয়ান ভির্ৎজের দারুণ পাস থেকে গোল করেন লেরয় সানে। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলের দেখা পান ৩০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে দ্বিতীয় দ্রুততম গোলদাতার রেকর্ডও গড়েন তিনি।
শুরুর এই গোল দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ম্যাচটি সহজেই জিতে নেবে জার্মানি। কিন্তু মাঠের চিত্র দ্রুতই বদলে যায়।
গোল হজম করার পর এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙে পড়েনি ইকুয়েডর। বরং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে তারা। মাত্র নবম মিনিটে নিলসন অ্যাঙ্গুলো দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরান। জার্মান রক্ষণভাগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই গোলটি আদায় করে নেয় ইকুয়েডর।
প্রথমার্ধে দুই দলই একাধিক আক্রমণ করলেও আর কোনো গোল হয়নি। ফলে ১-১ সমতা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পেনাল্টির সুযোগ পেয়েছিল জার্মানি। তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) পর্যালোচনার পর সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়।
এই সিদ্ধান্ত যেন আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে ইকুয়েডরকে। তারা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে ধারাবাহিক আক্রমণ চালাতে থাকে। জার্মানির ডিফেন্স ও মিডফিল্ড ক্রমেই চাপে পড়ে যায়।
ম্যাচের ৭৭তম মিনিটে কর্নার থেকে আসে নির্ণায়ক মুহূর্ত। প্রথম সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলেও দ্বিতীয় চেষ্টায় কোনো ভুল করেননি গঞ্জালো প্লাতা। তাঁর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইকুয়েডর।
শেষ দিকে জার্মানি মরিয়া হয়ে সমতায় ফেরার চেষ্টা চালায়। তবে ইকুয়েডরের রক্ষণভাগ ছিল দুর্ভেদ্য। উল্টো আরও কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল লাতিন আমেরিকার দলটি। যদিও জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়েরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ ব্যবধান আর বাড়তে দেয়নি।
শেষ বাঁশি বাজতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেস। তিনি সরাসরি গ্যালারিতে উঠে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উদযাপনে যোগ দেন। পুরো স্টেডিয়াম তখন ইকুয়েডরের সমর্থকদের উল্লাসে মুখর। খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সমর্থক—সবাই মিলে যেন এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী হন।
সংবাদ সম্মেলনে বেকাসেস বলেন, “এটি আমাদের দেশের জন্য অসাধারণ একটি দিন। আমরা চেয়েছিলাম ইতিহাস গড়তে, দেশের মানুষকে এমন একটি উপহার দিতে যা তারা দীর্ঘদিন মনে রাখবে। আজ আমরা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছি। এখন সবাই আনন্দ করুন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, চাইলে এক গ্লাস বিয়ার পান করুন।”
তার এই মন্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠিন সংগ্রামের গল্প। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে আইভরি কোস্টের কাছে হেরে যায় ইকুয়েডর। দ্বিতীয় ম্যাচে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি।
তবে সেই ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে নিজেদের পরিকল্পনায় অটল ছিল কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়রা। তার ফল মিলেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই।
বেকাসেস বলেন, “আমরা কখনোই আতঙ্কিত হইনি। আমাদের কৌশল এবং ফুটবল দর্শনে বিশ্বাস রেখেছি। আমি মনে করি, আগের ম্যাচগুলোর ফলাফল আমাদের প্রকৃত পারফরম্যান্সের প্রতিফলন ছিল না। খেলোয়াড়রা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।”
জার্মানির মতো শক্তিশালী দলকে হারানোর পর ইকুয়েডরের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ইতিহাস গড়ে নকআউটে ওঠার পাশাপাশি দলটি প্রমাণ করেছে, তারা বড় দলের বিপক্ষেও সমান লড়াই করতে পারে।
এখন সমর্থকদের চোখ নকআউট পর্বে। এই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারলে বিশ্বকাপে আরও বড় চমক দেখানোর সামর্থ্য রয়েছে ইকুয়েডরের। ঐতিহাসিক এই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং দেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


