বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা এগোলেও এই ঘটনার পর পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হামলার পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শান্তি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উভয় দেশ একটি সমঝোতা স্মারকেও স্বাক্ষর করে। সেই সমঝোতায় মোট ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলোর বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনা নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
তবে আলোচনার একপর্যায়ে মতপার্থক্য তীব্র হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পারস্পরিক অভিযোগের কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং হুমকির অভিযোগের পর ইরানের প্রতিনিধি দল বৈঠক মাঝপথে ত্যাগ করে। যদিও বৈঠক পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে ৬০ দিনের একটি রোডম্যাপে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছিল।
ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় একটি পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাঙ্কারে অজ্ঞাত একটি বস্তু আঘাত হানে। প্রাথমিকভাবে এটিকে ক্ষেপণাস্ত্র বলে সন্দেহ করা হলেও ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
আঘাতের পরপরই জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও জাহাজটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য একটি ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় কোনো নাবিক আহত হননি। জাহাজে থাকা সবাই নিরাপদে রয়েছেন।
এখন পর্যন্ত কোনো দেশ, গোষ্ঠী বা সংগঠন এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার জন্য কাউকে দায়ী করা হচ্ছে না।
তবে এই ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিপিং কোম্পানিগুলোর বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।
ইরান ও আমেরিকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু নতুন হামলার ঘটনায় সেই আশাবাদ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখাই হবে উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যাতে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু না হয়।
হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে সাম্প্রতিক হামলার অভিযোগ আবারও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। যদিও হামলার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের পরিচয় এখনও স্পষ্ট নয়, তবুও ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল না হলে এই উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


