বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, নাটকীয়তা এবং ফুটবলের সেরা লড়াই। ২০২৬ বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। টুর্নামেন্টের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেখা গেছে অসাধারণ গোল, চমকপ্রদ ফলাফল এবং দারুণ সব ম্যাচ। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলে চালু হওয়া নয়টি নতুন নিয়ম।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এসব নিয়ম নিয়ে যেমন ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল, তেমনি গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার পর এগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও শুরু হয়েছে মূল্যায়ন। কিছু নিয়ম ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, আবার কিছু সিদ্ধান্ত ফুটবলপ্রেমীদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফিফার মূল লক্ষ্য ছিল খেলার গতি বাড়ানো, সময় নষ্ট কমানো এবং রেফারিংকে আরও নির্ভুল করা। অনেক ক্ষেত্রেই সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। বিশেষ করে সময়ক্ষেপণ কমাতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে, সব নিয়ম সমানভাবে জনপ্রিয় হয়নি। বিশেষ করে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক বা পানীয় বিরতি নিয়ে সমর্থক ও ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, এতে ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হচ্ছে।
কর্নার ও ফ্রি-কিকের সময় খেলোয়াড়দের ধাক্কাধাক্কি, জার্সি টানা কিংবা প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলের বড় সমস্যা ছিল।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) এখন কর্নার বা ফ্রি-কিক নেওয়ার আগেই এসব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা যদি প্রতিপক্ষকে অবৈধভাবে আটকে রাখেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ফলে কর্নারের সময় অপ্রয়োজনীয় শারীরিক সংঘর্ষ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে।
ভিএআর চালুর পর থেকে প্রায় প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টেই বিতর্ক দেখা গেছে। এবারও কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উদাহরণ হিসেবে স্কটল্যান্ডের পেনাল্টির দাবি নাকচ হওয়া কিংবা জার্মানির একটি গোল নিয়ে বিতর্ক উল্লেখযোগ্য। তবে সামগ্রিকভাবে আগের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় ভিএআর নিয়ে আলোচনা অনেকটাই কম হয়েছে।
এর অন্যতম কারণ, ভিএআরের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এখন ভুল পরিচয়ে কার্ড দেখানো, দ্বিতীয় হলুদ কার্ড কিংবা ভুলভাবে কর্নার দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারছে।
নতুন নির্দেশনার ফলে রেফারিরা এখন খেলোয়াড়দের সামান্য স্পর্শেই ফাউল বাঁশি বাজাচ্ছেন না।
অনেক ফুটবলার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিপক্ষের সংস্পর্শ খুঁজে ফ্রি-কিক আদায়ের চেষ্টা করতেন। এখন সেই সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে। ফলে খেলার ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে এবং অপ্রয়োজনীয় বিরতি কমেছে।
ফুটবলে সময়ক্ষেপণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এবার সেটি কমাতে একাধিক নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- থ্রো-ইন নিতে সর্বোচ্চ ৫ সেকেন্ড সময়।
- গোল কিক বা কর্নার নিতে ৫ সেকেন্ডের বেশি দেরি করলে বল প্রতিপক্ষের দখলে যাবে।
- বদলি হওয়া খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হবে, না হলে পরিবর্তিত খেলোয়াড় পরবর্তী খেলা শুরু না হওয়া পর্যন্ত মাঠে নামতে পারবেন না।
- চিকিৎসার জন্য মাঠের বাইরে গেলে সাধারণভাবে এক মিনিট পর্যন্ত পুনরায় মাঠে ফিরতে পারবেন না। তবে গোলরক্ষক বা মাথায় আঘাতের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকবে।
এসব নিয়মের কারণে ম্যাচে অযথা সময় নষ্টের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
সবচেয়ে আলোচিত নিয়মগুলোর একটি হলো প্রতিপক্ষের সঙ্গে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলার সময় মুখ ঢেকে রাখলে লাল কার্ড দেখানোর বিধান।
এই নিয়ম বাস্তবায়নে অবশ্য ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এক ম্যাচে প্যারাগুয়ের এক খেলোয়াড় একই কাজের জন্য লাল কার্ড দেখলেও, অন্য ম্যাচে একই ধরনের আচরণ করেও আরেকজন তারকা ফুটবলার শাস্তি পাননি। ফলে নিয়ম প্রয়োগে সমতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, খেলোয়াড় বা কোচ যদি রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান, তাহলে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হলো মাঠে বিশৃঙ্খলা কমানো এবং রেফারির প্রতি সম্মান বজায় রাখা।
প্রতি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের পানীয় বিরতি চালু করা হয়েছে।
যদিও খেলোয়াড়দের শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পেয়েছে, তবুও অনেক সমর্থকের অভিযোগ, ম্যাচের গতি এবং উত্তেজনা এতে কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে যখন কোনো দল আক্রমণের ছন্দে থাকে, তখন এই বিরতি খেলায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই নতুন নিয়মগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে।
১. কর্নার ও ফ্রি-কিকের আগে ধস্তাধস্তি বা ব্লকিং পর্যবেক্ষণে ভিএআরের ব্যবহার।
২. প্রতিপক্ষের সঙ্গে আক্রমণাত্মকভাবে কথা বলার সময় মুখ ঢেকে রাখলে লাল কার্ডের সুযোগ।
৩. রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে গেলে সরাসরি লাল কার্ড।
৪. থ্রো-ইন নিতে সর্বোচ্চ ৫ সেকেন্ড সময়।
৫. গোল কিক ও কর্নার নেওয়ার জন্যও ৫ সেকেন্ডের সীমা।
৬. বদলি হওয়া খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ত্যাগ করতে হবে।
৭. চিকিৎসার জন্য মাঠ ছাড়লে সাধারণভাবে এক মিনিট পর মাঠে ফেরার অনুমতি।
৮. দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, ভুল পরিচয়ে কার্ড এবং ভুল কর্নারের সিদ্ধান্তে ভিএআরের হস্তক্ষেপ।
৯. প্রতি অর্ধে একবার তিন মিনিটের বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক।
বিশ্বকাপে নতুন নিয়ম চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল খেলার মান উন্নত করা, সময়ক্ষেপণ কমানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও নির্ভুলতা আনা। প্রথম দুই সপ্তাহের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, বেশ কয়েকটি নিয়ম ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে সময় নষ্ট কমানো, কর্নারে ধস্তাধস্তি নিয়ন্ত্রণ এবং ভিএআরের বিস্তৃত ব্যবহারে সুফল মিলেছে।
তবে সব নিয়ম সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। হাইড্রেশন ব্রেক এবং কিছু নিয়মের প্রয়োগে অসঙ্গতি এখনও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। নকআউট পর্বে এই নিয়মগুলোর বাস্তব প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। শেষ পর্যন্ত ফুটবলপ্রেমীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে নিয়মগুলোর ধারাবাহিক ও ন্যায্য প্রয়োগের ওপর।


