বাংলাদেশিদের জন্য আবারও স্বাভাবিকভাবে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর রোববার থেকে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু করায় স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ ভ্রমণপ্রত্যাশীদের মধ্যে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা চালু হওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
গত ২৫ জুন ঢাকার ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার পরিদর্শনকালে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঘোষণা দেন যে ২৮ জুন থেকে স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে। সেই ঘোষণা অনুযায়ী রোববার থেকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশন নিয়মিত ভিসা আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে।
এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে শুধুমাত্র সীমিত পরিসরে মেডিকেল ভিসা দেওয়া হচ্ছিল। পর্যটন, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা কার্যত বন্ধ থাকায় হাজারো বাংলাদেশিকে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু ভ্রমণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে সাক্ষাৎকার বা ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য ভারতকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতেন। ভিসা বন্ধ থাকায় সেই সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
ফলে বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যবসায়িক সফর কিংবা তৃতীয় কোনো দেশের ভিসা আবেদন—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আবেদনকারীদের।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম চালুর ঘোষণা একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। এটি দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ভারত নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়াকে অনেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
ভিসা চালুর সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের সম্পর্কে কিছু সংবেদনশীল ঘটনা আলোচনায় ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে হয়রানির অভিযোগ ঘিরে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে থাকা অবস্থায় ভারতীয় হাইকমিশনারের ভিসা চালুর ঘোষণা অনেকের নজর কেড়েছে। ফলে এই সিদ্ধান্তকে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি কৌশলগত কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
ভিসা চালু হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু ভিসা চালু করলেই দুই দেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হবে না।
সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ বা পুশ-ইন ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির কারণ। এই বিষয়ে কার্যকর সমাধান না হলে পারস্পরিক বিশ্বাস আরও শক্তিশালী করা কঠিন হবে।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকলেও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনের জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় পরীক্ষাও বটে।
গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়েও সময়ে সময়ে আলোচনা ও মতপার্থক্য দেখা দেয়। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান বের করা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট নানা ইস্যুও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এসব বিষয়ে নিয়মিত সংলাপ ও যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সম্পর্কের উন্নতি টেকসই হবে না।
বাংলাদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং রোগীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত স্বস্তির খবর। নিয়মিত ভিসা চালু হওয়ায় মানুষ আবার সহজে ভারতে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও নতুন গতি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ যত বাড়বে, দুই দেশের সম্পর্কও তত বেশি শক্তিশালী হবে। কারণ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগও কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের একটি ইতিবাচক সূচনা। তবে এটিকে স্থায়ী অগ্রগতিতে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিয়মিত সংলাপ এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন।
যদি সীমান্ত সমস্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি দূর করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল ও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।


