আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষমতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ—অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হওয়া। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, সুপারকম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চিপ, ডেটা সেন্টার কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ি—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত তাপ কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অনেক সময় এই তাপের কারণে যন্ত্রের আয়ু কমে যায়, এমনকি হঠাৎ বিকলও হয়ে যেতে পারে।
এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে যুগান্তকারী এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা। তারা জীবন্ত ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে এমন একটি বিশেষ বায়োকম্পোজিট উপাদান তৈরি করেছেন, যা প্রচলিত থার্মাল ইন্টারফেস ম্যাটেরিয়ালের তুলনায় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি দক্ষতার সঙ্গে তাপ পরিবহন করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের উচ্চক্ষমতার ইলেকট্রনিক যন্ত্র আরও দ্রুত ঠান্ডা রাখা সম্ভব হবে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি, নক্সভিলের ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওয়েইনান শু। প্রায় তিন বছর ধরে পরিচালিত এই গবেষণায় অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (ডারপা)।
গবেষকদের মূল ধারণা ছিল প্রকৃতিকে শুধু অনুকরণ নয়, বরং জীবন্ত ব্যাকটেরিয়াকেই ক্ষুদ্র উৎপাদন কারখানা হিসেবে কাজে লাগানো। সেই লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে নতুন প্রজন্মের ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক বায়োকম্পোজিট প্রযুক্তি।
গবেষণায় ব্যাকটেরিয়াকে একটি প্রোগ্রামেবল মাইক্রোবিয়াল বায়োসিন্থেসিস প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাকটেরিয়াকে চিনি এবং প্রয়োজনীয় ধাতব আয়ন সরবরাহ করা হলে তারা একই সঙ্গে জৈব ও অজৈব উপাদান তৈরি করতে শুরু করে।
এই প্রাকৃতিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে এমন একটি উচ্চ তাপ-পরিবাহী বায়োকম্পোজিট তৈরি হয়, যা ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে দ্রুত তাপ অপসারণ করতে সক্ষম।
এই প্রযুক্তির অন্যতম বড় সুবিধা হলো পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া কক্ষ তাপমাত্রায় এবং জলীয় পরিবেশে সম্পন্ন করা যায়। ফলে উচ্চ তাপমাত্রা, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কিংবা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না।
প্রচলিত শিল্পপ্রযুক্তির তুলনায় এটি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইলেকট্রনিক যন্ত্রে প্রসেসর এবং কুলিং সিস্টেমের মাঝখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম বায়ুর ফাঁক থাকে। এই ফাঁক তাপ পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করে।
থার্মাল ইন্টারফেস ম্যাটেরিয়াল (টিআইএম) সেই ফাঁক পূরণ করে এবং প্রসেসর থেকে উৎপন্ন তাপ দ্রুত হিটসিঙ্ক বা কুলিং ডিভাইসে পৌঁছে দেয়। ফলে যন্ত্র নিরাপদ তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে।
নতুন উদ্ভাবিত ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক উপাদান এই কাজ আরও অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে করতে সক্ষম।
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনের পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে বায়োকম্পোজিটের তাপ পরিবাহিতা প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় করা যায়।
পরীক্ষায় এই উপাদান প্রচলিত থার্মাল ইন্টারফেস ম্যাটেরিয়ালের তুলনায় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি তাপ পরিবহন করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে উচ্চক্ষমতার প্রসেসর, এআই চিপ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র আরও কার্যকরভাবে ঠান্ডা রাখা সম্ভব হবে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল কম্পিউটার বা স্মার্টফোনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে—
- উচ্চক্ষমতার এআই চিপ
- সুপারকম্পিউটার
- বৈদ্যুতিক গাড়ি
- ব্যাটারি প্রযুক্তি
- ড্রোন
- ডেটা সেন্টার
- উন্নত শিল্পযন্ত্র
ইতোমধ্যে গবেষক দল সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। বর্তমানে তাদের লক্ষ্য উৎপাদন খরচ আরও কমানো এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি করা।
গবেষকদের বিশ্বাস, একই ধরনের জৈব উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরও অনেক উন্নত উপাদান তৈরি করা সম্ভব হবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- দুর্লভ খনিজ পুনরুদ্ধার প্রযুক্তি
- জৈব-সামঞ্জস্যপূর্ণ টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং উপাদান
- উন্নত প্রকৌশল উপকরণ
- পরিবেশবান্ধব শিল্প উপাদান
অর্থাৎ এই প্রযুক্তি শুধু ইলেকট্রনিক্স শিল্প নয়, চিকিৎসা, প্রকৌশল এবং খনিজসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ একাধিক খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষমতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে কার্যকর কুলিং প্রযুক্তির চাহিদাও। জীবন্ত ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক এই নতুন বায়োকম্পোজিট প্রযুক্তি যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতের স্মার্টফোন, কম্পিউটার, এআই প্রসেসর, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সুপারকম্পিউটার আরও দ্রুত, নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কম শক্তি ব্যবহার এবং অসাধারণ তাপ পরিবাহিতার সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি আগামী দিনের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলেই মনে করছেন গবেষকেরা।


