বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দাপুটে ফুটবল উপহার দিল আর্জেন্টিনা। এশিয়ার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ জর্ডনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটে জায়গা নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল। শুরুতে বিশ্রামে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে দুর্দান্ত এক ফ্রিকিক থেকে গোল করে নিজের নামের পাশে আরেকটি অনন্য রেকর্ড যোগ করেন লিওনেল মেসি।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলের দখল, আক্রমণ এবং সুযোগ তৈরির দিক থেকে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল আর্জেন্টিনার। জর্ডন রক্ষণাত্মক কৌশল নিলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের থামানো সম্ভব হয়নি।
ম্যাচের শুরুতেই চমক দেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। প্রথম একাদশে রাখা হয়নি অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে। তবে তাতে আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার কমেনি। প্রথম মিনিট থেকেই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে জর্ডনের রক্ষণে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে আলভারেজ, লাউতারো মার্টিনেজ ও লো সেলসোরা।
প্রথম ১২ মিনিটে গোল না এলেও একাধিক সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে জর্ডন বল নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো আক্রমণই গড়ে তুলতে পারেনি।
ম্যাচের ১৯তম মিনিটে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত গোল পায় আর্জেন্টিনা। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রিকিক থেকে দুর্দান্ত শটে জর্ডনের গোলরক্ষক ইয়াজিদ আবুলাইলাকে পরাস্ত করেন জিওভানি লো সেলসো। গোলরক্ষক সামান্য ভুল জায়গায় অবস্থান নেওয়ায় বল জালে জড়িয়ে যায় সহজেই।
এই গোলের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা এবং আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয়।
৩১ মিনিটে ব্যবধান ২-০ করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। প্রথমে লাউতারো মার্টিনেজের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে হেড করতে গিয়ে সেনেসির মাথায় বিপজ্জনকভাবে পা তুলে দেন জর্ডনের এক ডিফেন্ডার।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সহায়তায় ঘটনাটি পর্যালোচনা করে পেনাল্টির নির্দেশ দেন রেফারি। স্পট কিক থেকে কোনো ভুল করেননি মার্টিনেজ। তাঁর জোরালো শটে দ্বিতীয় গোল পেয়ে স্বস্তিতে যায় আর্জেন্টিনা।
প্রথমার্ধের শেষ পর্যন্ত জর্ডনের আট-নয়জন খেলোয়াড় নিজেদের অর্ধে নেমে রক্ষণ সামলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও আর্জেন্টিনার ধারালো আক্রমণ থামানো যায়নি। ওটামেন্ডি, লো সেলসো ও আলভারেজদের সমন্বিত ফুটবলে বারবার বিপাকে পড়ে জর্ডনের ডিফেন্স।
৪০ মিনিটের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আর্জেন্টিনার হাতে।
বিরতির পরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। ওটামেন্ডিদের নেতৃত্বে রক্ষণ ছিল শক্তিশালী, আর মাঝমাঠে প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগই দেয়নি বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এক পর্যায়ে ওটামেন্ডির হেড অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়। ফলে তৃতীয় গোলের অপেক্ষা আরও কিছুক্ষণ বাড়ে।
ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে একটি দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে ব্যবধান কমায় জর্ডন। ডান প্রান্ত থেকে ইহসান হাদ্দাদের নিখুঁত ক্রসে ছয় গজ বক্সে বল পেয়ে সহজেই জালে পাঠান আল তামারি।
এই গোলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-১। কিছুটা চাপের মুখে পড়লেও খুব দ্রুত নিজেদের ছন্দ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা।
৬০ মিনিটে মাঠে নামেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। নকআউটের আগে তাঁকে কিছু ম্যাচ অনুশীলন করানোর পাশাপাশি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে এই সিদ্ধান্ত নেন কোচ স্কালোনি।
মেসি মাঠে নামার পর আর্জেন্টিনার আক্রমণ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তাঁর পাস, বল নিয়ন্ত্রণ এবং চলাফেরা জর্ডনের ডিফেন্ডারদের বাড়তি চাপে ফেলে।
ম্যাচের ৮০তম মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সমর্থকেরা।
বক্সের ঠিক বাইরে ফাউলের শিকার হন মেসি নিজেই। এরপর ফ্রিকিক নিতে এগিয়ে এসে অসাধারণ দক্ষতায় বল জড়িয়ে দেন জর্ডনের জালে। গোলরক্ষক নড়ারও সুযোগ পাননি।
এই গোলে আর্জেন্টিনা ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এবং ম্যাচ কার্যত নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নেয়।
এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে মেসির ষষ্ঠ গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ১৯তম গোল। একই সঙ্গে টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে ফুটবল ইতিহাসে নতুন নজির গড়েন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিত হয়ে যায় আর্জেন্টিনার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। পুরো ম্যাচে বলের দখল, আক্রমণের সংখ্যা এবং গোলের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল স্কালোনির দল।
সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, প্রথম একাদশে মেসি না থাকলেও দল দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। পরে অধিনায়ক মাঠে নেমে নিজের স্বভাবসুলভ জাদু দেখিয়ে জয়কে আরও স্মরণীয় করে তুলেছেন।
জর্ডনের বিপক্ষে ৩-১ গোলের এই জয় শুধু গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেনি, বরং নকআউটের আগে আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাসও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দলের আক্রমণভাগ, মাঝমাঠ এবং রক্ষণ—তিন বিভাগই ছিল ছন্দে। আর লিওনেল মেসির রেকর্ড গড়া ফ্রিকিক গোল প্রমাণ করে দিয়েছে, বড় মঞ্চে তিনি এখনও প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
এখন নকআউট পর্বে একই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে শিরোপা রক্ষার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।


