সম্প্রতি ব্রাজিলের একটি কথিত রিকভারি ক্লিনিককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, এই ক্লিনিকে বিশেষ মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তাঁর অতীতের যৌন সম্পর্কের মানসিক প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারেন। বিষয়টি অনেকের কাছে কৌতূহলের হলেও বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এটি সমাজে ভুল বার্তা ছড়াতে পারে এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ‘বডি কাউন্ট’। সাধারণভাবে এটি একজন ব্যক্তি জীবনে কতজন সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছেন, সেই সংখ্যাকে বোঝায়। যদিও এটি কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞান বা মনোবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক পরিভাষা নয়, তবুও সামাজিক আলোচনায় শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে এই সংখ্যা নিয়ে মানুষ সামাজিক বিচার, সমালোচনা কিংবা মানসিক চাপে ভোগেন। বিশেষ করে নতুন সম্পর্কে জড়ানো বা বিয়ের আগে অতীত নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের একটি বিশেষ রিকভারি সেন্টার দাবি করছে যে নির্দিষ্ট কিছু মানসিক, আধ্যাত্মিক ও আত্মবিশ্লেষণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তাঁর অতীতের সম্পর্কের মানসিক বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনও শারীরিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়। বরং অতীতের অভিজ্ঞতা, অপরাধবোধ, অনুশোচনা কিংবা মানসিক ভার কাটিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার এক ধরনের মানসিক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা।
তবে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে ‘বডি কাউন্ট জিরো করা’ হিসেবে প্রচার করছেন, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিষেবার জন্য একজন ব্যক্তিকে প্রায় ১৩ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ১১ লক্ষ টাকারও বেশি।
এত ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও দাবি করা হচ্ছে, ৩০ বছরের বেশি বয়সী বহু নারী-পুরুষ এই ধরনের পরিষেবায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগ্রহীদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই তুলনামূলক বেশি।
সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, অতীত নিয়ে অপরাধবোধ কিংবা নতুন জীবন শুরু করার আকাঙ্ক্ষা অনেক মানুষকে এমন পরিষেবার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে যারা বিয়ের আগে নিজেদের অতীতকে মানসিকভাবে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চান, তারা এমন উদ্যোগের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন। অনেকেই মনে করেন, অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত বা সম্পর্কের স্মৃতি থেকে মুক্তি পেলে আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, মানসিক পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এর জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত কাউন্সেলিং বা মনোচিকিৎসাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
এই ক্লিনিকের কার্যক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য পোস্ট, ভিডিও ও আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বিষয়টিকে মজার ছলে দেখছেন, কেউ আবার এটিকে প্রতারণার সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
আবার অনেকে সত্যিই বিশ্বাস করছেন যে এমন একটি প্রক্রিয়া মানুষের মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত ক্লিনিকটির কার্যক্রম, সাফল্যের হার কিংবা দাবিগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য খুব সীমিত।
সমালোচকদের মতে, একজন মানুষের মূল্য কখনও তাঁর অতীতের সম্পর্কের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত নয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক জীবনের একটি অংশমাত্র, সেটিই একজন মানুষের চরিত্র বা মর্যাদার একমাত্র পরিচয় হতে পারে না।
তাদের আশঙ্কা, ‘বডি কাউন্ট’ নিয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া সমাজে আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এটি বিশেষ করে নারীদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ যদি অতীতের সম্পর্ক নিয়ে অপরাধবোধ, বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগেন, তাহলে ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত পরিষেবার পরিবর্তে একজন যোগ্য মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সিদ্ধান্ত।
অতীতের অভিজ্ঞতা জীবনের অংশ। সব অভিজ্ঞতাই সুখকর হয় না, কিন্তু সেগুলো থেকেই মানুষ শেখে এবং পরিণত হয়। অতীতকে মুছে ফেলার চেষ্টা করার পরিবর্তে সেটিকে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই মানসিকভাবে সুস্থ থাকার অন্যতম উপায়।
কাউন্সেলিং, থেরাপি, পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন এবং নিজের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি একজন মানুষকে নতুনভাবে জীবন শুরু করার শক্তি দিতে পারে।
ব্রাজিলের কথিত ‘বডি কাউন্ট’ রিকভারি ক্লিনিক ঘিরে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তৈরি হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে এখনও বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে। সম্পর্ক, ভালোবাসা কিংবা অতীতের অভিজ্ঞতা কোনও মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে না। বরং আত্মসম্মান, মানসিক সুস্থতা এবং নিজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবই একটি সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি।
যদি কেউ অতীতের সম্পর্ক নিয়ে মানসিক কষ্টে ভোগেন, তবে বিতর্কিত বা অপ্রমাণিত পরিষেবার দিকে না ঝুঁকে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত।


