গ্রুপ পর্বে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়েনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর। সমালোচনার ঝড়, প্রতিপক্ষ সমর্থকদের কটাক্ষ কিংবা নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন—কোনো কিছুই যেন পর্তুগাল অধিনায়ককে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গ্রুপ পর্ব শেষ, এবার শুরু হবে আসল যুদ্ধ। নকআউট পর্বেই নিজেদের প্রকৃত সামর্থ্য দেখাতে প্রস্তুত পর্তুগাল।
ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের একজন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক কিংবদন্তিকেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। রোনাল্ডোর ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।
একসময় যিনি একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতেন, এখন প্রতিপক্ষের শক্তিশালী রক্ষণভাগের সামনে তাঁকে তুলনামূলক অসহায় দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে তাঁর প্রভাব আগের মতো না থাকায় সমালোচনার মাত্রাও বেড়েছে।
কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল রোনাল্ডো ও পর্তুগালের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রতিপক্ষ কোচের কৌশলী পরিকল্পনার সামনে পর্তুগালের আক্রমণভাগ কার্যকর হতে পারেনি। বিশেষ করে রোনাল্ডোকে ঘিরে একাধিক ডিফেন্ডার মোতায়েন করায় তিনি নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলার সুযোগই পাননি।
পুরো ম্যাচে গোলমুখে তাঁর মাত্র একটি শট ছিল, যা তাঁর মানের একজন ফরোয়ার্ডের জন্য খুবই অস্বাভাবিক। ম্যাচজুড়ে বারবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আটকে যেতে হয়েছে তাঁকে।
ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে উপস্থিত প্রতিপক্ষ সমর্থকদের কাছ থেকে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানও শুনতে হয়েছে রোনাল্ডোকে। তাঁর নাম ধরে কটাক্ষ করা হয়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এসবের জবাব মাঠে নয়, দিয়েছেন নিজের বার্তায়। ম্যাচ শেষে সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন,
“গ্রুপ পর্ব শেষ হয়েছে। এখন শুরু হচ্ছে নকআউটের আসল লড়াই। সামনে কঠিন প্রতিপক্ষ থাকলেও আমাদের দল মানসিকভাবে প্রস্তুত এবং আত্মবিশ্বাসী।”
এই বার্তায় স্পষ্ট, সমালোচনার চেয়ে সামনে থাকা চ্যালেঞ্জকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন পর্তুগাল অধিনায়ক।
গ্রুপে রানার্সআপ হওয়ায় পর্তুগালের সামনে এখন আরও কঠিন পথ। নকআউট পর্বে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামতে হবে তাদের।
এই ম্যাচে জয় পেলে শুধু পর্তুগালই নয়, ব্যক্তিগতভাবেও রোনাল্ডো আবার আলোচনার কেন্দ্রে ফিরতে পারেন। কারণ বড় মঞ্চে বড় খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সবাই ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্সই প্রত্যাশা করে।
বাইরের সমালোচনা যতই বাড়ুক, পর্তুগাল ড্রেসিংরুমে রোনাল্ডোর প্রতি আস্থা অটুট। সাবেক ডিফেন্ডার ব্রুনো আলভেস প্রকাশ্যে অধিনায়কের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তাঁর মতে, যেকোনো পরিস্থিতিতেই রোনাল্ডোর ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত। তিনি মনে করেন, দলের প্রত্যেক ফুটবলারের দায়িত্ব অধিনায়কের সম্মান রক্ষায় সর্বোচ্চ লড়াই করা। সামনে ক্রোয়েশিয়ার মতো কঠিন প্রতিপক্ষ থাকলেও সেই বিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই।
পর্তুগালের প্রধান কোচ রবার্তো মার্টিনেজও রোনাল্ডোর সমালোচনার সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, শুধু গোলের সংখ্যা দিয়ে রোনাল্ডোর অবদান বিচার করা ঠিক হবে না।
কোচের ভাষায়, কলম্বিয়া পুরো ম্যাচে একাধিক ডিফেন্ডার দিয়ে রোনাল্ডোকে আটকে রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে তাঁর জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি হওয়া কঠিন ছিল। তবুও মাঠে তাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে বাড়তি সতর্ক রাখে এবং সেটিই দলের জন্য বড় সুবিধা।
বিশ্ব ফুটবলে রোনাল্ডোর জনপ্রিয়তা এখনও আকাশছোঁয়া। তবে বড় তারকাদের ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি থাকে। ভালো খেললে প্রশংসা, আর ব্যর্থ হলে সমালোচনা—দুটোই সমান তীব্রভাবে আসে।
এখন নকআউট পর্বে সেই সমালোচনার জবাব দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন রোনাল্ডো। একটি দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই বদলে দিতে পারে পুরো আলোচনার চিত্র।
গ্রুপ পর্বের হতাশা ভুলে নতুন উদ্যমে নকআউট পর্বে নামছে পর্তুগাল। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। অভিজ্ঞ এই তারকা বিশ্বাস করেন, আসল পরীক্ষা এখনও বাকি। সমর্থকদের প্রত্যাশা, সমালোচনার জবাব এবার তিনি দেবেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই। এখন দেখার বিষয়, নকআউটের মঞ্চে আবারও কি নিজের সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করতে পারেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই মহাতারকা।


