বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা আগেই দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এবার তিনি সেই প্রত্যাবর্তনের সম্ভাব্য সময়সীমাও উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক ইমেল সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই সব বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে বাংলাদেশে ফিরতে চান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, নানা প্রতিকূলতা, শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ আবারও জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে।
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার লক্ষ্য নিয়েই দেশে ফিরতে চান। তাঁর ভাষ্য, নানা সংকট ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “সব ধরনের বাধা এবং ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এই বছরেই আমার দেশে ফিরব।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
২০২৪ সালের আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। একই বছরের ৫ আগস্ট তিনি তাঁর বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
প্রায় দুই বছর পর দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক এবং রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়। বরং তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
তিনি দাবি করেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই তিনি দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে চান।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, মৃত্যুর ভয় তাঁর নেই। তিনি স্মরণ করেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার পরও তিনি দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি চালিয়ে গেছেন।
মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, এটি কোনো নিরপেক্ষ বিচার নয়; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অসাংবিধানিক একটি প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যেই বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থার প্রতীক।
তাঁর ভাষায়, অতীতেও বহুবার আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে, দলটি নানা সংকট ও দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের সমর্থনে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানেও শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে জনগণের সমর্থন পুনরুদ্ধার করছে বলে তাঁর বিশ্বাস।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার কাছে জানতে চাওয়া হয়, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা চলছে কি না।
জবাবে তিনি এমন সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং দলটি নিজের রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতেই এগিয়ে যেতে চায়।
বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিএনপি—উভয় পক্ষই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তাঁর মতে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিক সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। তাঁর মতে, সেই আদর্শ বাস্তবায়িত হলে ধর্মীয় উগ্রবাদ বা মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো, অন্যদিকে দেশে ফিরে রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ঘোষণা—দুটি বিষয়ই আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য ভবিষ্যতের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখা জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি।


