খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

কর্টিসল কমানোর ভাইরাল ট্রিক! সত্যিই কি জিভ বার করলেই মিলবে উপকার?

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ আজকের ব্যস্ত জীবনের নিত্যসঙ্গী। কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব—সবকিছু মিলিয়ে শরীরে বাড়তে থাকে স্ট্রেস হরমোন...
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালমেসির আর্জেন্টিনাকে থামাতে প্রস্তুত কাবো ভার্দে! কে এই রহস্যময় কোচ বুবিস্তা?

মেসির আর্জেন্টিনাকে থামাতে প্রস্তুত কাবো ভার্দে! কে এই রহস্যময় কোচ বুবিস্তা?

যে মারাদোনাকে দেখে বুবিস্তার ফুটবলপ্রেমের শুরু, আজ সেই দেশের আরেক কিংবদন্তি মেসিকে থামানোর পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন তিনি। বিশ্বের সেরা কোচরাও যাঁকে থামাতে হিমশিম খান, সেই মেসিকে আটকানো নিঃসন্দেহে কাবো ভার্দের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব ফুটবলে ছোট দলগুলোর স্বপ্ন সাধারণত বড় শক্তিগুলোর সামনে গিয়ে থেমে যায়। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপই কিছু নতুন গল্পের জন্ম দেয়। এবারের আসরে সেই রূপকথার গল্পের নাম কাবো ভার্দে। আর এই অসাধারণ যাত্রার নেপথ্যে রয়েছেন দলের প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো, যিনি সবার কাছে ‘বুবিস্তা’ নামেই পরিচিত।

চার দশক আগে গ্রামের একটি ভাড়া করা টেলিভিশনে ডিয়েগো মারাদোনার জাদুকরী ফুটবল দেখে যে কিশোরের মনে স্বপ্নের বীজ বপন হয়েছিল, আজ সেই মানুষই নিজের দেশকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তুলে ইতিহাস গড়েছেন।

কাবো ভার্দের বোয়া ভিস্তা দ্বীপের প্রত্যন্ত গ্রাম পোভোয়াকাও ভেলহায় বেড়ে ওঠেন পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো। তখন গ্রামে টেলিভিশন ছিল বিরল। বিশ্বকাপের সময় গ্রামের মানুষ মিলে একটি টিভি ভাড়া করতেন। সেই টিভির পর্দায় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো মারাদোনার অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ছোট্ট পেদ্রো।

সেই মুহূর্তেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, একদিন তিনিও ফুটবল খেলবেন। কিন্তু স্বপ্ন দেখা যত সহজ, বাস্তবতা ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। দারিদ্র্য আর সুযোগের অভাবে ফুটবল কেনার সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের। তাই তাঁর মা মোজা দিয়ে তৈরি করে দিয়েছিলেন প্রথম ফুটবল। সেই সামান্য বল নিয়েই শুরু হয়েছিল ভবিষ্যতের এই কোচের ফুটবলযাত্রা।

পরে দীর্ঘ ১১ বছর কাবো ভার্দে জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বুবিস্তা। খেলোয়াড় হিসেবে বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য না এলেও কোচের আসনে বসে তিনি বদলে দিয়েছেন দেশের ফুটবলের চিত্র।

স্থানীয় ভাষায় সবাই তাঁকে বুবিস্তা বলেই ডাকে। তাঁর নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে কাবো ভার্দে। বিশ্ব ফুটবলে এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে কাবো ভার্দেকে নিয়ে খুব কম মানুষই আশাবাদী ছিলেন। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের উপস্থিতিতে তাদের সম্ভাবনা প্রায় কেউই দেখেননি।

কিন্তু প্রত্যাশার চাপ না থাকায় বুবিস্তার দল নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলেছে। স্পেনের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে রুখে দিয়েছে তারা। এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ ড্র আদায় করে। সৌদি আরবের সঙ্গেও সমতা ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে কাবো ভার্দে।

দলের অন্যতম ভরসার নাম সেন্টার ব্যাক লোগান কোস্তা। গত বছর এসিএল ইনজুরির কারণে প্রায় ১০ মাস মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। অনেকেই ভেবেছিলেন তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষের পথে।

কিন্তু বুবিস্তা তাঁর ওপর আস্থা হারাননি। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা দেন এবং তিনটি গ্রুপ ম্যাচেই খেলান। কোস্তাও কোচের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখে দুর্দান্ত রক্ষণ সামলেছেন।

কাবো ভার্দের বেশ কয়েকজন ফুটবলারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। মিডফিল্ডার জেমিরো মন্টেইরোর জন্ম জার্মানিতে। পরে তিনি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গোলেই মূল পর্বে ওঠে কাবো ভার্দে।

অন্যদিকে কেভিন পিনা যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠেন। পরে তাঁকে খুঁজে বের করেন সাবেক অধিনায়ক কার্লোস মোরাইস। বর্তমানে তিনিও দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার।

২৪ বছর বয়সী হেলেয়ো ভারেলা ইসরায়েলের ক্লাব ফুটবলে খেলেন। উরুগুয়ের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে গোল করে দলকে মূল্যবান এক পয়েন্ট এনে দেন। তাঁর প্রতিভা আগেভাগেই চিনতে পেরেছিলেন বুবিস্তা।

বিশ্বকাপে কাবো ভার্দের অন্যতম নায়ক গোলরক্ষক ভোজিনহা। স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক অসাধারণ সেভ করে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল গভীর বেদনায় ভরা। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই হারিয়েছিলেন দাদা-দাদিকে। প্রথমদিকে তাঁর মা ভিসা না পাওয়ায় মাঠে বসে খেলা দেখতে পারেননি। পরে অবশ্য গ্যালারিতে উপস্থিত হয়ে ছেলের ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স উপভোগ করেন।

স্পেন ম্যাচের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা রাতারাতি কয়েক হাজার থেকে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায়।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ফুটবলেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বুবিস্তা বিদেশে থাকা সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যবহার করেছিলেন লিংকডইন।

অনেকেই প্রথমে ভেবেছিলেন এটি হয়তো মজা করার জন্য পাঠানো বার্তা। তাঁদের একজন ছিলেন পিকো লোপেস। পরে বিষয়টি সত্যি বুঝে তিনি জাতীয় দলে যোগ দেন। সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে তাঁর বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল।

৩৬ বছর বয়সী অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। প্রায় শত ম্যাচ খেলা এই অভিজ্ঞ ফুটবলার মাঠে কোচের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

তাঁর নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস পুরো দলকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

নকআউট পর্বে কাবো ভার্দের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, যার নেতৃত্বে রয়েছেন লিওনেল মেসি।

যে মারাদোনাকে দেখে বুবিস্তার ফুটবলপ্রেমের শুরু, আজ সেই দেশের আরেক কিংবদন্তি মেসিকে থামানোর পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন তিনি। বিশ্বের সেরা কোচরাও যাঁকে থামাতে হিমশিম খান, সেই মেসিকে আটকানো নিঃসন্দেহে কাবো ভার্দের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বুবিস্তা বলেছিলেন, স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার রয়েছে এবং অসম্ভব বলে কিছু নেই। তাঁর দল সেই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

স্পেনকে রুখেছে, উরুগুয়েকে আটকে দিয়েছে, বিশ্বকাপের নকআউটে উঠে ইতিহাস লিখেছে। এবার সামনে আর্জেন্টিনা। ফল যাই হোক, কাবো ভার্দে ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে সাহস, পরিকল্পনা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে ছোট দেশও বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে পারে।

কাবো ভার্দের এই যাত্রা শুধু একটি ফুটবল দলের সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং বিশ্বাসের এক অনন্য উদাহরণ। মোজা দিয়ে বানানো বল থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চ বুবিস্তার জীবন প্রমাণ করে যে সীমাবদ্ধতা কখনও স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারে না।

এখন দেখার বিষয়, তাঁর কৌশল ও অনুপ্রেরণা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও নতুন কোনো বিস্ময়ের জন্ম দিতে পারে কি না।