এক যুগের দীর্ঘ অপেক্ষার পর পরিবারে নতুন সদস্যের আগমন যেন এনে দিল অন্যরকম এক আনন্দ। আর সেই আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতে নাটোরের সিংড়ায় এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করলেন নানা মো. হান্নান। ১২ বছর পর নাতির জন্মের খুশিতে তিনি ঘোড়ার গাড়িতে শোভাযাত্রা বের করেন এবং এলাকাবাসীর মাঝে মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। ঘটনাটি ইতোমধ্যেই এলাকায় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার শেরকোল ইউনিয়নের জোরমল্লিকা গ্রামের বাসিন্দা মো. হান্নানের জীবনে এই দিনটি ছিল বিশেষ। তার নিজের কোনো পুত্র সন্তান নেই। একমাত্র মেয়ে পান্না খাতুনের বিয়ের পর তার সংসারে প্রথমে জন্ম নেয় একটি কন্যা সন্তান। কিন্তু পরিবারে একটি পুত্র সন্তানের জন্য অপেক্ষা ছিল দীর্ঘ।
অবশেষে ১২ বছর পর পান্না খাতুন ও তার স্বামী মনির হোসেনের ঘর আলো করে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান আব্দুর রহমান বিন মুসালিন। শিশুটির জন্মে শুধু বাবা-মাই নয়, সবচেয়ে বেশি আনন্দে ভাসেন তার নানা মো. হান্নান। কারণ, নিজের কোনো ছেলে না থাকায় নাতির আগমন যেন তার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করে দেয়।
এই আনন্দকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করতে বুধবার সকালে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন মো. হান্নান। সকাল ১০টার দিকে ৭ মাস বয়সী নাতিকে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে শুরু হয় আনন্দ শোভাযাত্রা।
শোভাযাত্রাটি শুরু হয় জোরমল্লিকা গ্রাম থেকে এবং প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে শাহবাজপুর গ্রামে গিয়ে শেষ হয়, যেখানে তার জামাইয়ের বাড়ি। পুরো পথজুড়ে স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।
এই দৃশ্য দেখতে রাস্তার দুই পাশে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ। কেউ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, কেউ আবার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন মোবাইলে ধারণ করেন।
শুধু শোভাযাত্রাই নয়, এই আনন্দকে আরও বড় করে তুলতে প্রায় তিন হাজার পিস মিষ্টি বিতরণ করেন হান্নান। তিনি বিশ্বাস করেন, সুখের খবর একা উপভোগ না করে সবার সঙ্গে ভাগ করে নিলে আনন্দ আরও বেড়ে যায়।
মিষ্টি নিতে আসা স্থানীয়রা জানান, এমন দৃশ্য তারা আগে কখনও দেখেননি। অনেকেই বলেন, এটি শুধু একটি পারিবারিক আনন্দ নয়, পুরো গ্রামের জন্য একটি উৎসবের মতো ছিল।
আনন্দে আপ্লুত মো. হান্নান বলেন,
“আমার নিজের কোনো ছেলে নেই, শুধু একটি মেয়ে। তার ঘরে এতদিন পর একটি নাতি হয়েছে। আল্লাহ আমাকে এই সুখ দিয়েছেন, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু হতে পারে না। আমি চাই সবাই আমার নাতির জন্য দোয়া করুক।”
তার কথায় স্পষ্ট ছিল একজন দাদু-নানার গভীর আবেগ, ভালোবাসা এবং সন্তুষ্টি।
শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া এক প্রতিবেশী বলেন, হান্নান ভাইয়ের আনন্দ দেখে আমরাও খুব খুশি। এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন এই এলাকায় আগে কখনো দেখিনি। এটি এখন পুরো গ্রামের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই আয়োজনের প্রশংসা করেছেন। শেরকোল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. বুলেট হোসেন বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর পর পরিবারে পুত্র সন্তানের জন্ম হওয়ায় এই আয়োজন সত্যিই ব্যতিক্রমী। এমন আনন্দঘন মুহূর্তে এলাকাবাসীও অংশ নিতে পেরে উচ্ছ্বসিত।
এই ঘটনা শুধু একটি শিশুর জন্ম উদযাপন নয়, বরং এটি পরিবার, ভালোবাসা এবং সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ। বর্তমান সময়ে যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক অনেক সময় দূরত্বে হারিয়ে যায়, সেখানে মো. হান্নানের এই আয়োজন দেখিয়ে দিল—একটি নতুন প্রাণের আগমন কীভাবে পুরো সমাজকে আনন্দে ভাসাতে পারে।
নাটোরের এই ছোট্ট গ্রামের ব্যতিক্রমী আয়োজন এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনায় উঠে এসেছে। অনেকেই এটিকে ভালোবাসা ও পারিবারিক আবেগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।


