বেনাপোল স্থলবন্দরে আবারও পণ্য চালানে অনিয়মের অভিযোগে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কাগজপত্রবিহীন বা ঘোষণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্য পরিবহনের সন্দেহে একটি ভারতীয় ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে বন্দরের ভেতরে চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই ঘটনাটি ঘটেছে যশোরের অন্তর্গত গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোল স্থলবন্দর এলাকায়, যা বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত আমদানি-রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
কাস্টমস ও বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতের দিকে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩১ নম্বর ইয়ার্ড থেকে ট্রাকটি আটক করা হয়। ট্রাকটি ভারতীয় নম্বর প্লেটধারী এবং খৈলবাহী পণ্য পরিবহন করছিল বলে জানা গেছে।
পরে কাস্টমস কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ট্রাকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, পণ্যের পরিমাণ ও ঘোষণাপত্রের মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, যশোরের ঝিকরগাছা এলাকার আমদানিকারক মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের নামে সরিষার খৈলবাহী এই চালানটি বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। ঝিকরগাছা এলাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনাকারী এই প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রাকটি ২৩ জুন বন্দরে প্রবেশ করে।
এরপর ২৫ জুন ট্রাকটি ৩৫ নম্বর শেডে খালাসের কথা বলে বের হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে, ঘোষিত পণ্যের বড় একটি অংশ শেডে প্রবেশের আগেই গোপনে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বিকেলে ট্রাকটি আবার বন্দর এলাকায় প্রবেশ করলে কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করে সেটিকে থামিয়ে দেয়। এরপর কাস্টমসকে খবর দেওয়া হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তল্লাশি শুরু হয়।
বাংলাদেশ কাস্টমস কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ট্রাকটি বিস্তারিতভাবে তল্লাশি করা হয়। এতে ১৪০ বস্তা খৈল ও ৫০টি খালি বস্তা পাওয়া যায়।
মোট পণ্যের ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৭,১৫৭ কেজি। এর মধ্যে খৈলের নেট ওজন পাওয়া যায় ৬,৯১৩ কেজি।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী জানান, ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ট্রাকে থাকার কথা ছিল প্রায় ১০ টন ৯০ কেজি পণ্য। অর্থাৎ বাস্তবে পাওয়া পণ্যের সঙ্গে ঘোষণার মধ্যে প্রায় ৩,১৭৭ কেজি ঘাটতি ধরা পড়ে। এই ঘাটতির পেছনে পরিকল্পিতভাবে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা থাকতে পারে।
কাস্টমসের একাধিক সূত্র বলছে, ট্রাকটি যখন শেডে ঢোকার আগেই বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছিল, তখনই পণ্যের একটি অংশ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
৫০টি খালি বস্তা পাওয়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব বস্তায় আগে অন্য পণ্য ছিল, যা পরে সরিয়ে ফেলা হয়।
এই পুরো ঘটনাটি এখন গভীরভাবে তদন্ত করছে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। অভিযোগ উঠেছে, এই চালানের সঙ্গে জড়িত চক্রটি একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেছে।
এ ক্ষেত্রে মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক হাফিজুর রহমান হ্যাপি দাবি করেন, তাদের কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি এই চালান গ্রহণ বা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত নয়। তিনি জানান, তাদের নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ কার্যক্রম চালিয়েছে এবং এ বিষয়ে তারা লিখিতভাবে কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন।
বন্দর এলাকার ৩১ নম্বর শেডে দায়িত্বরত কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, পণ্যের কাগজপত্রে অসামঞ্জস্য দেখা যাওয়ায় বিষয়টি দ্রুত কাস্টমসকে জানানো হয়। পরে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে ট্রাকটি আটক করা হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক চালানটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
ঘটনার পর বন্দর, কাস্টমস এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। পুরো ঘটনাটি একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের কাজ কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেনাপোল বন্দর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরগুলোর একটি হওয়ায় এখানে নিয়মিতভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়। তবুও কিছু অসাধু চক্র মাঝে মাঝে বিভিন্ন কৌশলে অবৈধ কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করে।
এই ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে বন্দর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। বিশেষ করে পণ্য খালাস, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা এবং কাগজপত্র যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার দাবি উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হলে এ ধরনের অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে।


