বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে দিল্লি বিমানবন্দরে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে ভারতের দেওয়া ব্যাখ্যাকে সন্তোষজনক মনে করছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিষয়টি শুধু দুর্ভাগ্যজনকই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা।
চলতি মাসের শুরুতে ভারত মহাসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোর জোট আইওআরএ (IORA)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে ভারতের দিল্লিতে যাওয়ার কথা ছিল জাহেদ উর রহমানের। তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে যাত্রা অব্যাহত রাখতে বাধা দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং ভারতের কাছে ব্যাখ্যা চায়। পরবর্তীতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও সেটি বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ভারতীয় পক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক নয়।
তিনি জানান, জাহেদ উর রহমানের সফর এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আগেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে জানানো হয়েছিল। ফলে বিমানবন্দরে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না বলে মনে করছে ঢাকা।
বাংলাদেশের মতে, আগাম অবহিত করার পরও একজন সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে এমন আচরণ দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, আইওআরএ বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন—এ তথ্য ভারতকে পূর্বেই জানানো হয়েছিল। কূটনৈতিক প্রটোকল অনুযায়ী এমন সফরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সাধারণত আগাম অবহিত থাকে এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে দিল্লি বিমানবন্দরে জাহেদ উর রহমানকে যাত্রা অব্যাহত রাখতে বাধা দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের কাছে বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, যথাযথ অবহিতকরণের পরও এমন ঘটনা ঘটায় তারা হতাশ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্পষ্টভাবে বলেছেন, আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো থাকার পরও বিমানবন্দরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা দুর্ভাগ্যজনক এবং দুঃখজনক।
কূটনৈতিক মহলের বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সরকারি প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা সাধারণত খুব কমই দেখা যায়। এ কারণেই বিষয়টি বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একই সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থা নিয়ে করা মন্তব্য সম্পর্কেও প্রশ্নের মুখোমুখি হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর জবাবে বাংলাদেশের মুখপাত্র বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিজ দেশের সব নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকার দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুনর্ব্যক্ত করেছে যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে।
সরকারের মতে, বাংলাদেশে সকল নাগরিক সমান মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করেন এবং এই নীতির বাস্তবায়নে রাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে একসঙ্গে কাজ করে থাকে। সেই কারণে দিল্লি বিমানবন্দরে জাহেদ উর রহমানকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনার দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।


