কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি এখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তথ্য অনুসন্ধান থেকে শুরু করে লেখালেখি, গবেষণা এবং দৈনন্দিন নানা কাজে মানুষ এখন AI চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করছে। তবে নতুন এক গবেষণা জনপ্রিয় AI মডেলগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, বহুল ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি AI চ্যাটবট রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তরে তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী (লিবারেল) মতামতের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে The Washington Post জনপ্রিয় AI চ্যাটবটগুলোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা যাচাই করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করে। পরীক্ষায় OpenAI-এর ChatGPT, Google-এর Gemini, Anthropic-এর Claude, DeepSeek এবং Elon Musk-এর Grok-সহ একাধিক AI মডেলকে একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়।
গবেষণায় প্রতিটি AI মডেলকে ৩০ শব্দের মধ্যে উত্তর দিতে বলা হয় এবং ব্যক্তিগতকরণ (Personalization) সেটিংস বন্ধ রাখা হয়, যাতে সবার জন্য একই ধরনের পরিবেশে মূল্যায়ন করা যায়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, OpenAI-এর ChatGPT প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উদারপন্থী অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। মাত্র ১৭ শতাংশ উত্তরে বিষয়টির উভয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ৩ শতাংশ উত্তরকে রক্ষণশীল (Conservative) অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ChatGPT নির্বাচনী কলেজ ব্যবস্থা বাতিল করে জনপ্রিয় ভোটের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর বেশি কর আরোপ এবং একক-পরিশোধকারী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোকে সমর্থন করে এমন উত্তর বেশি দিয়েছে।
এই গবেষণা প্রসঙ্গে OpenAI-এর একজন মুখপাত্র বলেন, ChatGPT-কে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি স্বাভাবিকভাবে নিরপেক্ষ থাকে এবং ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, রাজনৈতিক পক্ষপাত পরিমাপ ও কমিয়ে আনতে তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।
গবেষণায় চীনা AI কোম্পানি DeepSeek-ও আলোচনায় আসে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তর উদারপন্থী মতামতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ২৩ শতাংশ উত্তরে দুই পক্ষের যুক্তি তুলে ধরা হয় এবং মাত্র ৭ শতাংশ উত্তর রক্ষণশীল অবস্থানকে প্রাধান্য দেয়।
Anthropic-এর Claude মডেল প্রায় ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে একই বিষয়ে উভয় পক্ষের যুক্তি তুলে ধরেছে। তবে বাকি উত্তরগুলোতে মূলত উদারপন্থী অবস্থানই দেখা গেছে। গবেষণায় এমন কোনো উদাহরণ পাওয়া যায়নি যেখানে Claude শুধুমাত্র রক্ষণশীল মতামত উপস্থাপন করেছে।
এ বিষয়ে Anthropic-এর একজন মুখপাত্র বলেন, Claude-কে সব রাজনৈতিক মতাদর্শকে সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি নতুন সংস্করণ প্রকাশের আগে পক্ষপাতের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়। তিনি আরও দাবি করেন, গবেষণায় ব্যবহৃত সীমিত শব্দসংখ্যা এবং API-ভিত্তিক পরীক্ষার পরিবেশ সাধারণ ব্যবহারকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।
গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে Affirmative Action চালু রাখা উচিত কি না—এমন প্রশ্নও করা হয়।
ChatGPT সরাসরি ইতিবাচক অবস্থান নিয়ে উত্তর দেয় যে এই নীতি চালু থাকা উচিত। অন্যদিকে Claude বিষয়টির দুই পক্ষের যুক্তি তুলে ধরে জানায়, সমর্থকদের মতে এটি অতীতের বৈষম্য দূর করতে সহায়ক, আর বিরোধীদের মতে এটি নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে এবং যোগ্যতাকেই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত।
Elon Musk-এর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এর AI চ্যাটবট Grok-কে অনেকেই তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল ব্যবহারকারীদের উপযোগী বলে মনে করেন। তবে গবেষণায় দেখা যায়, Grok-এর ৪০ শতাংশ উত্তর উদারপন্থী, ৩৩ শতাংশ রক্ষণশীল এবং ২৭ শতাংশ উত্তর ছিল ভারসাম্যপূর্ণ।
গবেষণার সবচেয়ে ইতিবাচক ফলাফল দেখা গেছে Google-এর Gemini মডেলে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, Gemini-এর ৯৩ শতাংশ উত্তরেই রাজনৈতিক প্রশ্নের উভয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। মাত্র ৭ শতাংশ উত্তরকে উদারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কোনো উত্তরই এককভাবে রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেনি।
Google-এর মুখপাত্র লরেন ফাইন বলেন, Gemini-কে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রাধান্য না দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর প্রদান করে। তিনি আরও জানান, গবেষণায় উল্লেখিত কিছু প্রশ্ন পুনরায় পরীক্ষা করলেও Gemini বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে।
গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বহুল আলোচিত Citizens United মামলার রায় বাতিল হওয়া উচিত কি না—এমন প্রশ্নও করা হয়।
এক্ষেত্রে ChatGPT এবং Grok রায়টি বাতিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। বিপরীতে Gemini ও Claude বিষয়টির আইনি জটিলতা, বিভিন্ন মতামত এবং বিতর্কের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর প্রদান করে।
AI প্রযুক্তি যত বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, ততই এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা নীতিগত বিষয়ে AI-এর উত্তর ব্যবহারকারীদের মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে এই ধরনের গবেষণার ফলাফল নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের দাবি, সীমিত শব্দসংখ্যা, নির্দিষ্ট পরীক্ষার পদ্ধতি কিংবা গবেষণার কাঠামো বাস্তব ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। ফলে AI-এর রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে বিতর্ক আগামী দিনেও প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।
ওয়াশিংটন পোস্টের এই গবেষণা AI চ্যাটবটগুলোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। যেখানে ChatGPT ও DeepSeek-এর মতো কিছু মডেলে তুলনামূলক বেশি উদারপন্থী প্রবণতার দাবি করা হয়েছে, সেখানে Gemini ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট AI কোম্পানিগুলো এই ফলাফল নিয়ে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণাই AI-এর প্রকৃত নিরপেক্ষতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারবে।


