ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, নাটকীয়তা আর অসাধারণ কিছু মুহূর্তের অপেক্ষা। তবে এবারের বিশ্বকাপ যেন অন্য মাত্রা পেয়েছে। মাঠে শুধু জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, গোলের বন্যাও দেখছেন ফুটবলপ্রেমীরা। গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই ২০২৬ বিশ্বকাপ গোলের সংখ্যায় পেছনে ফেলে দিয়েছে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপকে। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ডসহ তারকা ফুটবলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নতুন ইতিহাস গড়ছে।
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো গোলের সংখ্যা। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের দারুণ প্রদর্শনী দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি দল যেন রক্ষণাত্মক মানসিকতার বদলে গোল করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মোট ৬৪টি ম্যাচে হয়েছিল ১৭২টি গোল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই রেকর্ড ভেঙে গেছে অনেক আগেই। অবাক করা বিষয় হলো, গ্রুপ পর্ব এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবুও গোলের সংখ্যা ইতিমধ্যেই আগের বিশ্বকাপের মোট গোলকে ছাড়িয়ে গেছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত পরিবর্তন, দ্রুতগতির খেলা এবং আক্রমণভিত্তিক পরিকল্পনা গোলের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
আগের বিশ্বকাপগুলোতে অংশ নিত ৩২টি দেশ। তবে এবার প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপে। ফলে ম্যাচের সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে।
যেখানে ২০২২ সালে মোট ম্যাচ হয়েছিল ৬৪টি, সেখানে এবার সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। শুধু গ্রুপ পর্বেই রয়েছে ৭২টি ম্যাচ।
তবে শুধু ম্যাচের সংখ্যা বাড়ার কারণেই গোল বেড়েছে— এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ গোলের গড় হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিটি ম্যাচেই দর্শকরা পাচ্ছেন উত্তেজনা আর গোলের রোমাঞ্চ।
কাতার বিশ্বকাপের ১৭২ গোলের রেকর্ড ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি। প্রতিযোগিতার ৫৯তম ম্যাচেই সেই ইতিহাস বদলে যায়।
তুরস্কের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্ডার অস্টন ট্রাস্টি টুর্নামেন্টের ১৭৩তম গোলটি করেন। এর মধ্য দিয়ে আগের বিশ্বকাপের গোলসংখ্যা পেছনে পড়ে যায়।
পরে ওই ম্যাচে আরও গোল হয়। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হলেও মোট গোলের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এখন পর্যন্ত গোলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৭-এ।
এখনও টুর্নামেন্টের অনেক ম্যাচ বাকি থাকায় এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
এই নতুন রেকর্ড নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এবারের বিশ্বকাপে আক্রমণাত্মক ফুটবল অসাধারণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, কাতার বিশ্বকাপের ১৭২ গোলের রেকর্ড ভেঙে যাওয়া প্রমাণ করছে দলগুলো কতটা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। এই বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন মানুষের মনে থাকবে।
ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই মনে করছেন, টুর্নামেন্ট যত এগোবে গোলের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে।
এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও আলো ছড়াচ্ছেন তারকারা। গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন লিওনেল মেসি। ইতোমধ্যে তিনি পাঁচটি গোল করেছেন।
চারটি গোল করে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপে, ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং আর্লিং হালান্ড।
এছাড়া তিনটি করে গোল করেছেন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। আরও প্রায় ২০ জন খেলোয়াড় দুটি করে গোল করেছেন।
এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, এবার গোল শুধু কয়েকজন তারকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দলের একাধিক খেলোয়াড় গোল করছেন, যা টুর্নামেন্টকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
এখনও বিশ্বকাপের ৪৪টি ম্যাচ বাকি রয়েছে। তাই বর্তমান গতিতে গোল হতে থাকলে নতুন এক মহারেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক বিশ্বকাপ এসেছে এবং গেছে, কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবে গোলের উৎসবের জন্য। মাঠে আক্রমণাত্মক ফুটবল, তারকাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং অবিশ্বাস্য সব মুহূর্ত মিলিয়ে এটি ইতিমধ্যেই বিশেষ এক আসরে পরিণত হয়েছে।
ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন একটাই প্রশ্নে— শেষ পর্যন্ত গোলের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?


