গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি দাবি করেছেন, দেশের অনেক গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। একইসঙ্গে আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ চালুর বিষয়ে সরকারের পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রোববার (৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনে সম্পূরক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব বিষয় উত্থাপন করেন। বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং এবং শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার বক্তব্য সংসদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
রুমিন ফারহানা বলেন, লোডশেডিং কিংবা মেরামতজনিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, বাস্তবে গ্রামাঞ্চলের মানুষ প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তার মতে, এই পরিস্থিতি শুধু সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং কৃষি, শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি সংসদে উল্লেখ করেন যে, দেশের উন্নয়ন ও ডিজিটাল অগ্রগতির কথা বলা হলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনও নিয়মিত বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সেবার বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীর পূর্ববর্তী একটি প্রতিশ্রুতির বিষয়ও স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে পহেলা মে’র মধ্যে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার বা সার কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেখানে এখনও গ্যাস সরবরাহ চালু হয়নি। এ অবস্থায় তিনি জানতে চান, কবে নাগাদ আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে এবং উৎপাদন কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় শুরু করা যাবে।
রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দেশের বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশে গ্যাসের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় সরকারকে বিভিন্ন খাতের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস প্রয়োজন, অন্যদিকে সার কারখানাগুলোও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সীমিত মজুদের কারণে সব খাতে একসঙ্গে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আপাতত আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না।
মন্ত্রী আরও জানান, দেশে গ্যাসের ঘাটতি কাটাতে নতুন করে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, গত ১৭ বছরে কোনো উল্লেখযোগ্য ড্রিলিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও ড্রিলিং কার্যক্রম শুরু করেছে।
তার আশা, ভবিষ্যতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে দেশের জ্বালানি সংকট কিছুটা হলেও কমবে। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারের মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আলোচনার একপর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্ত্রীর আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি মন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংসদে তিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ চালুর কথা বলেছিলেন।
স্পিকার বলেন, সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। তিনি ইঙ্গিত করেন যে, পূর্বে ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে গ্যাস সরবরাহ শুরু না হওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
স্পিকার ভবিষ্যতে সংসদে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য, সম্ভাবনা, ড্রিলিং কার্যক্রম এবং বাস্তব পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তার মতে, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা হওয়ায় সেখানে দেওয়া বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির প্রতি জনগণের বিশেষ আস্থা থাকে। তাই প্রতিটি ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবভিত্তিক হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে গ্রামীণ জনগণ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থার অভিযোগ করছে, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। অন্যথায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দেশের অর্থনীতি এবং শিল্পখাতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সংসদে রুমিন ফারহানার উত্থাপিত প্রশ্ন এবং সরকারের জবাব দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহ বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তব ফল বয়ে আনে এবং গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ সংকট কতটা কমানো সম্ভব হয়।


