খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অস্বস্তিতে কেন তামান্না ভাটিয়া ?

বলিউড ও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তামান্না ভাটিয়া আবারও আলোচনায়। তবে এবার কোনো নতুন সিনেমা বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং নারী শিল্পীদের প্রতি...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালদেশজুড়েনদীতে ভাসমান  মরদেহ : হত্যা নাকি কোনো অপরাধের ছক?

নদীতে ভাসমান  মরদেহ : হত্যা নাকি কোনো অপরাধের ছক?

নির্জন কোনো স্থানে একজন মানুষকে হত্যা করা হয়। এরপর হাত-পা বেঁধে, কখনও কোমরে ভারী কিছু বেঁধে, কখনও মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়ার আগেই মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় নদীর জলে।

বাংলাদেশের নদীগুলোতে একের পর এক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এখন শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এসব ঘটনায় সামনে আসছে ভয়াবহ এক বাস্তবতা—নদী কি এখন অপরাধীদের জন্য প্রমাণ গোপনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হয়ে উঠছে?

গভীর রাত। নির্জন কোনো স্থানে একজন মানুষকে হত্যা করা হয়। এরপর হাত-পা বেঁধে, কখনও কোমরে ভারী কিছু বেঁধে, কখনও মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়ার আগেই মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় নদীর জলে। কয়েক দিন পর সেই লাশ ভেসে ওঠে অন্য কোথাও—কখনও ঘাটের পাশে, কখনও কচুরিপানার আড়ালে, কখনও শাখা নদীর জলে। এমন দৃশ্য এখন দেশের বিভিন্ন নদীতে প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মেঘনা নদীর একটি শাখা ‘মরা গাং’ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ। তার হাত-পা বাঁধা ছিল, কোমরে বাঁধা ছিল একটি বস্তা। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, কয়েক দিন আগে তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

একই দিনে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে নলজুর নদী থেকেও উদ্ধার হয় এক নারীর ভাসমান মরদেহ। এর কিছুদিন আগে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ফুলদী নদী থেকে উদ্ধার হয় এক তরুণীর মরদেহ। পরে তদন্তে জানা যায়, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো আলাদা হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—অপরাধের ধরন প্রায় একই। আর এটাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

নৌ-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মাত্র তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন নদী থেকে ১৪৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।

আরও ভয়ংকর তথ্য মিলেছে পাঁচ বছরের হিসাব থেকে। এই সময়ে দেশের নদ-নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ। এর মধ্যে ৬৩৯টি মরদেহের পরিচয় আজও অজানা। পরিচয় না মেলায় এসব মরদেহ শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।

এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের অপরাধ বাস্তবতার একটি গভীর সংকেত।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হলো তদন্তকে বিভ্রান্ত করা এবং আলামত নষ্ট করা।

পানিতে দীর্ঘ সময় থাকলে মরদেহে পচন ধরে যায়। এতে আঙুলের ছাপ মুছে যেতে পারে, মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যায়, শরীরের আঘাতের চিহ্নও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে ভিকটিমের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এখানেই অপরাধীরা বড় সুবিধা পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পরিচয় শনাক্ত করা না যায়, তাহলে মামলার অগ্রগতি প্রায় থেমে যায়। ফলে অনেক সময় হত্যার রহস্যও চাপা পড়ে যায়।

শুধু পারিবারিক বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিশোধ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসার বিরোধ কিংবা সম্পত্তি নিয়ে সংঘাতও হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পরিকল্পিতভাবে খুন করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়। এতে অপরাধের স্থান ও মরদেহ উদ্ধারের স্থান আলাদা হয়ে যায়, যা তদন্তকে আরও জটিল করে তোলে।

ধরা যাক, ঢাকায় কাউকে হত্যা করা হলো, কিন্তু তার মরদেহ ভেসে উঠলো মুন্সীগঞ্জে। তখন তদন্তকারী সংস্থাকে প্রথমেই বুঝতে হয়—হত্যা কোথায় হয়েছে?

এই একটি প্রশ্নই পুরো তদন্তকে দীর্ঘ ও জটিল করে দেয়।

নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরিচয় শনাক্ত করা।

অনেক সময় মরদেহ এতটাই পচে যায় যে মুখ চিনে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আঙুলের ছাপও নষ্ট হয়ে যায়। কখনও শুধু হাড়গোড় উদ্ধার হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর ধরন বোঝা গেলেও, ভিকটিম কে—সেই প্রশ্নের উত্তর না থাকলে তদন্ত অচল হয়ে যায়।

গত পাঁচ বছরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া বহু হত্যা মামলার এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। অনেক মামলা বছরের পর বছর তদন্তাধীন।

এটি প্রমাণ করে, নদী শুধু মরদেহ গোপনের জায়গা নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করারও একটি কার্যকর কৌশল হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্ত করলেই হবে না; অপরাধ ঠেকাতে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

নদীর যেসব ব্রিজ, ঘাট, ফেরিঘাট বা নির্জন পয়েন্টে বেশি মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে আলাদা নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

সেখানে স্থাপন করা যেতে পারে:

• সিসিটিভি ক্যামেরা

• নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি

• রাতের বিশেষ টহল

• সন্দেহজনক নৌযানের পর্যবেক্ষণ

একইসঙ্গে পুলিশ, নৌ-পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডাটাবেজ, ডিএনএ পরীক্ষা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় তথ্যভান্ডার এবং ডিজিটাল রেকর্ড সমন্বয় করলে অনেক অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত শনাক্তকরণ সম্ভব হলে অপরাধীদের ধরাও সহজ হবে।

প্রশ্নটা এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে করা প্রয়োজন।

যেভাবে দেশের নদীগুলোতে অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে নদীকে অপরাধীরা শুধু জলপথ হিসেবে নয়, অপরাধ গোপনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করছে।

এটি বন্ধ করতে হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দরকার সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত তদন্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

কারণ নদীতে ভেসে ওঠা প্রতিটি মরদেহ শুধু একটি মৃত্যু নয়; অনেক সময় তা লুকিয়ে রাখা এক ভয়ংকর অপরাধের নীরব সাক্ষী।