চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ১০৯ তলা সিটিক টাওয়ারে একটি ছোট বিমান আঘাত হানার ঘটনায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই ভবনটির ভেতরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার পর পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শুক্রবার (২৬ জুন) প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত কিংবা ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি বেইজিংয়ের ৫২৮ মিটার উচ্চতার সিটিক টাওয়ারের ওপরের অংশের একটি তলায় আঘাত হানে। সংঘর্ষের পর ভবনের বাইরের অংশ থেকে ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে যায়। এতে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিমানে কতজন আরোহী ছিলেন, এটি কোথা থেকে উড্ডয়ন করেছিল কিংবা কী পরিস্থিতিতে ভবনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে—এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে।
দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি সতর্কতা জারি করে ভবনটি খালি করা হয়। ভবনের ভেতরে থাকা মানুষজনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক নারী জানান, সন্ধ্যা ৬টার দিকে হঠাৎ জরুরি ভিত্তিতে সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়। পরিস্থিতি এতটাই আকস্মিক ছিল যে তিনি নিজের পরিচয়পত্র কিংবা ব্যক্তিগত ব্যাগ নেওয়ারও সুযোগ পাননি। জীবন বাঁচাতে দ্রুত ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
দুর্ঘটনার পর সিটিক টাওয়ারের চারপাশের সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ। সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয় এবং পুরো এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়।
একই সঙ্গে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার রাখা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, বিমানটির নিবন্ধন নম্বর ছিল বি-১২পিপি।
ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা **ফ্লাইটরাডার২৪**-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি চীনের **স্টারএয়ার এয়ারক্রাফট কোম্পানি** নির্মিত **সানওয়ার্ড এসএ৬০এল অরোরা** মডেলের একটি দুই আসনের হালকা বিমান।
এ ধরনের বিমান সাধারণত ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিনোদনমূলক উড্ডয়ন এবং স্বল্প দূরত্বের আকাশ ভ্রমণের কাজে ব্যবহার করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান বিমানটি পরিচালনা করছিল, যারা ব্যক্তিগত পাইলট প্রশিক্ষণ এবং আকাশপথে পর্যটনসেবা দিয়ে থাকে।
তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে বিমানটির পরিচালনা, উড্ডয়নের অনুমতি এবং দুর্ঘটনার পেছনের কারণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
চীনের রাজধানীতে যেকোনো ধরনের হালকা বিমান উড্ডয়নের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম কার্যকর রয়েছে।
বেইজিংয়ে ব্যক্তিগত বা হালকা বিমান আকাশে ওড়ানোর আগে চীনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সের অনুমতি বাধ্যতামূলক।
এছাড়া সম্প্রতি শহরজুড়ে সাধারণ বিনোদনমূলক উড্ডয়ন এবং ড্রোন পরিচালনার ওপরও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এখন সরকার ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের উড্ডয়ন বৈধ নয়।
সিটিক টাওয়ার বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবন এবং চীনের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা। ২০১৮ সালে নির্মিত ১০৯ তলা এই ভবনটির উচ্চতা প্রায় ৫২৮ মিটার।
এটি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান **চায়না ইন্টারন্যাশনাল ট্রাস্ট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন (CITIC)**-এর প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি এটি বেইজিংয়ের আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।
দুর্ঘটনার পর চীনা কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, বিমানের যাত্রাপথ, আরোহীর সংখ্যা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এদিকে ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট


