বাংলাদেশের বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে আসে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও গভীর ও কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে মতবিনিময় করেন দুই দেশের নেতারা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানায় চীন সরকার। তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা এবং গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
এ সফরের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সমঝোতা দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
এই সমঝোতাগুলোর মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিন জানান, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, এই প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে চীন কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী।
তার ভাষায়, “পানি ব্যবস্থাপনা, নদী শাসন এবং ড্রেনেজ উন্নয়নে চীনের ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হতে চায়।”
এটি বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ তিস্তা নদীভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাকে আধুনিক করবে না, বরং নদীভাঙন রোধ এবং পানি সংরক্ষণেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
মাহাদী আমিন আরও জানান, তিস্তার মতো বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (জয়েন্ট ফিজিবিলিটি স্টাডি) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও চীন এ বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এই সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয়, সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল বিশ্লেষণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই শুরুতেই কারিগরি বিশ্লেষণ প্রকল্পকে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। প্রতিবছর বর্ষা, বন্যা, নদীভাঙন ও পানি নিষ্কাশন সমস্যা দেশের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
চীন দীর্ঘদিন ধরে বৃহৎ নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ নির্মাণ, পানি সংরক্ষণ এবং ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়নে সফল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা মনে করেন, চীনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকায় কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বৈঠকে বাণিজ্যিক সম্পর্কও বড় গুরুত্ব পায়। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
বাংলাদেশ চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলক কম।
এ কারণে বৈঠকে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য চীনা বাজারে আরও বড় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, ওষুধ এবং চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে কথা হয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
চীনের কারিগরি সহায়তা এবং যৌথ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পটি দেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশে পানি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন মডেল তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে অন্য নদী প্রকল্পেও অনুসরণ করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের আগ্রহ শুধু একটি উন্নয়ন সহযোগিতা নয়; এটি বাংলাদেশ-চীন কৌশলগত সম্পর্কের আরও শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।


