ইংল্যান্ডের মিডফিল্ড সেনসেশন Jude Bellingham বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ঘানার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর ম্যাচসেরার পুরস্কার পেলেও তা নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। ম্যাচ শেষে তার মুখের অভিব্যক্তি, বক্তব্য এবং মাঠে ঘটে যাওয়া এক উত্তপ্ত বিতর্ক নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ফুটবল বিশ্বে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-২ গোলের দারুণ জয়ের পর ইংল্যান্ড সমর্থকরা আশা করেছিলেন ঘানার বিপক্ষেও জয় তুলে নেবে দলটি। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। দীর্ঘ সময় বল দখলে রেখেও গোলের দেখা পায়নি থমাস টুখেলের শিষ্যরা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এক পয়েন্ট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে থ্রি লায়ন্সদের।
ম্যাচজুড়ে ইংল্যান্ডের দখলে ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ বল। তবুও ঘানার সুসংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে বারবার ব্যর্থ হয় ইংলিশ আক্রমণভাগ।
তরুণ মিডফিল্ডার Nico O’Reilly একবার ক্রসবারে বল মেরে সুযোগ নষ্ট করেন। অন্যদিকে অধিনায়ক Harry Kane খুব কাছ থেকে নিশ্চিত গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন। এসব সুযোগ কাজে লাগাতে না পারায় ম্যাচ শেষ হয় ০-০ সমতায়।
ঘানার রক্ষণভাগ ছিল অসাধারণ সংগঠিত। তারা ইংল্যান্ডকে মাত্র তিনটি অন-টার্গেট শটে সীমাবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়। ফলে ইংল্যান্ডের আক্রমণাত্মক শক্তি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়েন বেলিংহ্যাম। এরপর অবাক করার মতো বিষয় হলো, তাকেই ম্যাচসেরা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পুরস্কার হাতে ছবি তোলার সময়ও তাকে বেশ গম্ভীর এবং বিরক্ত দেখাচ্ছিল। পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই পুরস্কার তার প্রাপ্য ছিল না।
বেলিংহ্যাম বলেন, তিনি মনে করেন ঘানার কোনো খেলোয়াড় এই সম্মান পাওয়ার বেশি যোগ্য ছিলেন, কারণ তারা দুর্দান্তভাবে রক্ষণ সামলেছেন এবং ইংল্যান্ডকে গোল করতে দেননি।
এই মন্তব্য ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। কারণ আধুনিক ফুটবলে নিজের পুরস্কার নিয়ে এমন সৎ মূল্যায়ন খুব বেশি দেখা যায় না।
ড্রয়ের পর ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বেলিংহ্যাম একটি মজার কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ইংল্যান্ড যেন বড় টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় ম্যাচে এসে আটকে যায়। প্রথম ম্যাচ জয়ের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ড্র করার প্রবণতা আবারও দেখা গেল।
পরিসংখ্যানও তার কথার পক্ষে কথা বলে। এটি টানা চতুর্থ বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট যেখানে ইংল্যান্ড গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে জয় পেতে ব্যর্থ হয়েছে।
বেলিংহ্যামের মতে, ঘানা শুরু থেকেই ড্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলেছে। তবে তিনি প্রতিপক্ষকে কৃতিত্ব দিতে ভোলেননি। তার মতে, ঘানা নিজেদের পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে এবং দুর্দান্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেছে।
ম্যাচের আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে।
ঘানার ডিফেন্ডার Jerome Opoku-এর ওপর একটি দেরিতে ট্যাকল করেন বেলিংহ্যাম। তবে রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখাননি।
এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঘানার কোচ Carlos Queiroz। মাঠের সাইডলাইনে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যে কুইরোজকে তার স্টাফদের হস্তক্ষেপে শান্ত করতে হয়।
পরবর্তীতে কুইরোজ দাবি করেন, বেলিংহ্যাম কথোপকথনের সময় কিছু আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। সেই ঘটনাই ম্যাচ শেষে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
ইংল্যান্ডের কোচ Thomas Tuchel ম্যাচ শেষে ঘানার রক্ষণভাগের প্রশংসা করেন।
তার মতে, ঘানা অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলেছে এবং ইংল্যান্ডের আক্রমণকে কার্যকরভাবে থামিয়ে দিয়েছে। ইংল্যান্ড বল দখলে আধিপত্য দেখালেও শেষ তৃতীয়াংশে সৃজনশীলতা ও কার্যকারিতার অভাব ছিল স্পষ্ট।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ঘানার রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা এতটাই কার্যকর ছিল যে ইংল্যান্ডের তারকা খেলোয়াড়রাও নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেননি।
ড্রয়ের পরও দলকে ইতিবাচক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন।
তার মতে, এটি এমন একটি ম্যাচ ছিল যেখানে সামান্য ভাগ্য সহায় হলে ইংল্যান্ড জয় নিয়েও মাঠ ছাড়তে পারত। তবে প্রতিপক্ষের শক্তিশালী রক্ষণ এবং মধ্যমাঠের চাপ ইংল্যান্ডকে ভুগিয়েছে।
কেইন জানান, পুরো ম্যাচে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে মার্কিং করা হয়েছে। বিশেষ করে ঘানার মিডফিল্ডার Thomas Partey তার চলাফেরা সীমিত করে রেখেছিলেন। ফলে তিনি স্বাভাবিকভাবে খেলার সুযোগ পাননি।
তবুও ইংল্যান্ডের অধিনায়ক বিশ্বাস করেন, দল ধীরে ধীরে ম্যাচে উন্নতি করেছে এবং সামনে পানামার বিপক্ষে আরও ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারবে।
ঘানার বিপক্ষে ড্রয়ের ফলে ইংল্যান্ড এখনও গ্রুপ এল-এর শীর্ষে রয়েছে। তবে শেষ ম্যাচে পানামার বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করেই নকআউট পর্বে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যেতে চাইবে দলটি।
এই ম্যাচে ইংল্যান্ড বুঝতে পেরেছে যে শুধু বল দখল করলেই জয় নিশ্চিত হয় না। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার জন্য আরও সৃজনশীলতা, দ্রুততা এবং কার্যকর ফিনিশিং প্রয়োজন।
অন্যদিকে জুড বেলিংহ্যামের ম্যাচসেরা পুরস্কার নিয়ে অসন্তুষ্টি এবং মাঠের বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে যে তিনি নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে কতটা আত্মসমালোচনামূলক। একজন বিশ্বমানের ফুটবলারের এই মানসিকতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
বিশ্বকাপের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে এখন সবার নজর থাকবে বেলিংহ্যাম ও ইংল্যান্ড দলের দিকে। তারা কি সমালোচনার জবাব মাঠে দিতে পারবে, নাকি দ্বিতীয় ম্যাচের হতাশা তাদের পথ আরও কঠিন করে তুলবে—সেই উত্তর মিলবে খুব শিগগিরই।


