খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

অবৈধ অস্ত্রের দাপটে  প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন

দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধী চক্রের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালজাতীয়অবৈধ অস্ত্রের দাপটে  প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন

অবৈধ অস্ত্রের দাপটে  প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও অপরাধীদের কাছে থাকা অস্ত্রের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধী চক্রের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক তিন মাসে দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়ে গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে দেশে ধারাবাহিকভাবে হত্যার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি মামলা হয়েছে।

গত বছরের একই সময়ে হত্যার মামলা ছিল ৯৯৩টি। তবে এর মধ্যে অনেকগুলো মামলা ছিল আগের ঘটনার ধারাবাহিকতা। ২০২৪ সালের একই সময়ে হত্যার মামলা হয়েছিল ৭৯৪টি। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা নতুন করে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা এবং অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে ১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, প্রায় ১ হাজার ৭৮৫ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ৫২টি ম্যাগাজিন, ৩২টি হাতবোমা এবং বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও অপরাধীদের কাছে থাকা অস্ত্রের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের তিন মাসের পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এখানে ২০৭টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬টি, রাজশাহীতে ১০৬টি এবং খুলনায় ৮৪টি হত্যার মামলা হয়েছে।

মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। রাজধানীতে ৫৭টি হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

দিনদুপুরে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।

চট্টগ্রামের রাউজান এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। গত ১৩ জুন রাউজানের একটি ব্যস্ত বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি একটি অটোরিকশায় এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

এর আগে একই উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে জানে আলম সিকদার নামে আরেক রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাউজানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিরোধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে শুধু রাউজানেই অন্তত ২৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র লুট হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক অস্ত্র উদ্ধার করলেও এখনো কিছু অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে পৌঁছানোর কারণে সহিংসতা আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন।

মে মাসে রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এপ্রিল ও মার্চ মাসেও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, গুলি এবং হত্যার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের ঘটনা রয়েছে।

গত দেড় বছরে যশোর সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যেখানে বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অপরাধীরা ছোট আকারের অস্ত্র সহজে বহন ও লুকিয়ে রাখতে পারায় এসব অস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের পিস্তল ও অস্ত্র অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিদেশি অস্ত্রসহ একাধিক অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু অপরাধী ও সন্ত্রাসী পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারানো এলাকা ও প্রভাব ফিরিয়ে আনতে সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অস্ত্রের উৎস বন্ধ করা, সীমান্ত নজরদারি বাড়ানো এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।