ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক উজ্জ্বল নাম সুমন কল্যাণপুর আর নেই। রবিবার নিজের মুম্বইয়ের লোখন্ডওয়ালার বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রবীণ শিল্পী। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি বলিউডের প্লেব্যাক গানের জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। যদিও তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের কথা। কারণ, একসময় সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে লতার কণ্ঠের আশ্চর্য মিল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
তবে শুধুমাত্র কণ্ঠস্বরের মিল নয়, বলিউডে তাঁর উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বহুল আলোচিত অধ্যায়—লতা মঙ্গেশকর ও মহম্মদ রফির মধ্যকার মতবিরোধ। সেই ঘটনার পরই সুমন কল্যাণপুরের ক্যারিয়ারে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল বলে মনে করেন অনেক সঙ্গীতবিশারদ।
ষাট ও সত্তরের দশকে যখন বলিউডের সঙ্গীতজগতে লতা মঙ্গেশকরের আধিপত্য ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তখনই নিজের গায়কি ও প্রতিভার জোরে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন সুমন কল্যাণপুর। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ, নিখুঁত উচ্চারণ এবং আবেগঘন পরিবেশনা শ্রোতাদের মন জয় করেছিল।
যদিও তাঁকে প্রায়শই “লতার বিকল্প” হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছিল, সুমন কখনও সেই পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে একাধিক জনপ্রিয় গান উপহার দেন, যা আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে প্রিয়।
ষাটের দশকের শুরুতে বলিউডে গানের রয়্যালটি বা স্বত্বাধিকার নিয়ে একটি বড় বিতর্কের সূত্রপাত হয়। লতা মঙ্গেশকর মনে করতেন, গান জনপ্রিয় হলে তার আর্থিক সুবিধার একটি অংশ শিল্পীদেরও পাওয়া উচিত। তিনি গায়ক-গায়িকাদের জন্য রয়্যালটির দাবিতে সরব হন এবং সেই সময়ের প্রভাবশালী সঙ্গীত সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
অন্যদিকে মহম্মদ রফি এই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতেন। তিনি প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন। এই মতপার্থক্য ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত দূরত্বে রূপ নেয়।
২০০৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লতা মঙ্গেশকর নিজেই সেই ঘটনার কথা স্মরণ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, একটি বৈঠকে রফি তাঁকে ব্যঙ্গ করে “মহারানি” বলে সম্বোধন করেছিলেন। জবাবে লতা প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন তাঁকে এভাবে ডাকা হচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত দুই কিংবদন্তি শিল্পী একসঙ্গে গান না গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
লতা মঙ্গেশকর ও মহম্মদ রফির যুগলবন্দি ছিল বলিউড সঙ্গীতের অন্যতম আকর্ষণ। তাঁদের অসংখ্য ডুয়েট গান আজও শ্রোতাদের কাছে কালজয়ী। ফলে দুই শিল্পীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর সঙ্গীত পরিচালক ও প্রযোজকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
রফির সঙ্গে ডুয়েট গাওয়ার জন্য এমন একজন শিল্পীর প্রয়োজন ছিল, যার কণ্ঠে কোমলতা, মাধুর্য এবং শ্রুতিমধুরতা থাকবে। সেই সময়েই সামনে আসেন সুমন কল্যাণপুর।
তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে লতার কণ্ঠস্বরের মিল থাকার কারণে তিনি দ্রুত সঙ্গীত পরিচালকদের নজর কাড়েন। ফলস্বরূপ রফির সঙ্গে একের পর এক জনপ্রিয় গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি।
মহম্মদ রফির সঙ্গে সুমন কল্যাণপুরের বেশ কয়েকটি গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘আজকাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে’ এবং ‘তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে’।
এই গানগুলো শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, বরং সুমন কল্যাণপুরকে বলিউডের প্রথম সারির শিল্পীদের কাতারে নিয়ে যায়। শ্রোতারা তাঁর কণ্ঠকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন এবং তিনি নিজস্ব পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
অনেক সঙ্গীত সমালোচকের মতে, যদি লতা ও রফির মধ্যে সেই বিরোধ না তৈরি হতো, তাহলে হয়তো সুমনের ক্যারিয়ারের গতিপথ ভিন্ন হতে পারত। তবে এটাও সত্য যে সুযোগ পেলেও সেই সুযোগকে সফলতায় পরিণত করতে প্রতিভা ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, যা সুমনের মধ্যে ছিল প্রাচুর্যে।
বহু বছর ধরে চলা তুলনা ও আলোচনা সত্ত্বেও লতা মঙ্গেশকরের প্রতি কখনও বিরূপ মনোভাব দেখাননি সুমন কল্যাণপুর। বরং তিনি সবসময় লতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন।
২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে সুমন বলেছিলেন, লতা তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি জানান, সবার মতো তিনিও লতার গানের ভক্ত ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে লতা মঙ্গেশকর চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।
সুমনের কথায়, যখনই তাঁদের দেখা হতো, মনে হতো যেন বহু দিনের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, লতার মনেও একই অনুভূতি কাজ করত।
এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, গণমাধ্যমে যতই তুলনা হোক না কেন, দুই শিল্পীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও সম্মানপূর্ণ।
অনেকেই জানেন না যে লতা মঙ্গেশকর ও সুমন কল্যাণপুর একসঙ্গে গানও গেয়েছিলেন। ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মীনা কুমারী অভিনীত ‘চাঁদ’ ছবিতে তাঁরা যুগলকণ্ঠে পরিবেশন করেছিলেন ‘কভি আজ কভি কাল’ গানটি।
এই গানটি দুই শিল্পীর কণ্ঠসৌন্দর্যের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে আজও স্মরণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁদের ক্যারিয়ার আলাদা পথে এগোলেও সেই সঙ্গীতস্মৃতি আজও অমলিন।
সুমন কল্যাণপুরের প্রয়াণ ভারতীয় সঙ্গীতজগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন সুর, শব্দ ও আবেগ মিলিয়ে গান তৈরি হতো হৃদয়ের গভীরতা থেকে।
লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি এবং অন্যান্য কিংবদন্তি শিল্পীদের পাশে থেকেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সাফল্যের পেছনে যেমন ছিল সময়ের প্রেক্ষাপট, তেমনই ছিল অসাধারণ প্রতিভা, নিষ্ঠা এবং সঙ্গীতের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য কালজয়ী গান আগামী প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে। ভারতীয় প্লেব্যাক সঙ্গীতের ইতিহাসে সুমন কল্যাণপুরের নাম তাই চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।


