হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি সৌন্দর্য বরাবরই পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সবুজ জঙ্গলে মোড়া পাহাড়, ঠান্ডা আবহাওয়া আর মেঘে ঢাকা উপত্যকা যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার। কিন্তু সেই সুন্দর পাহাড়ই এবার ভয়াবহ দাবানলের কবলে পড়ে আতঙ্ক ছড়াল। আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত নামতে হল ভারতীয় বায়ুসেনাকে।
হিমাচল প্রদেশের সোলান জেলার জনপ্রিয় পাহাড়ি এলাকা কসৌলিতে আচমকাই জঙ্গলে আগুন লাগে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় গোটা এলাকা অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে উঠেছিল। শুকনো গাছের পাতা, ঝোপঝাড় আর গরম হাওয়া মুহূর্তের মধ্যে আগুনকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সেই আগুন এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
স্থানীয় প্রশাসন প্রথমে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও বড় সমস্যার মুখে পড়তে হয়। কারণ আগুন ছড়িয়েছিল এমন সব জায়গায়, যেখানে দমকলের গাড়ি পৌঁছনো কার্যত অসম্ভব। পাহাড়ি দুর্গম পথ, গভীর খাদ আর ঘন জঙ্গলের কারণে স্থলপথে আগুন নেভানো প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। তখনই সাহায্যের জন্য ডাকা হয় ভারতীয় বায়ুসেনাকে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত কাজে নামে ভারতীয় বায়ুসেনা। আগুন নেভানোর জন্য পাঠানো হয় শক্তিশালী এমআই-১৭ হেলিকপ্টার। এই বিশেষ হেলিকপ্টারগুলিতে ছিল ‘বাম্বি বাকেট’ প্রযুক্তি। এই ব্যবস্থার সাহায্যে কোনও জলাশয় থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ জল তুলে আগুনের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
চণ্ডীগড়ের শিবালিক পর্বতমালার পাদদেশে থাকা সুখনা দিঘি থেকে জল সংগ্রহ শুরু করে বায়ুসেনার হেলিকপ্টারগুলি। বিশাল বালতির মতো দেখতে বাম্বি বাকেটে জল ভরে তারা বারবার উড়ে যায় আগুনে ঘেরা পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে। তারপর আকাশ থেকে সরাসরি আগুনের ওপর জল ঢালতে থাকে।
বায়ুসেনার এই অভিযান ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ি এলাকায় ধোঁয়া, গরম বাতাস এবং কম দৃশ্যমানতার মধ্যেও পাইলটরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যান। জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই ৪০ হাজার লিটারেরও বেশি জল আগুনের ওপর ফেলা হয়েছে। তবে তাতেই কাজ থামেনি। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রাতের অন্ধকারও এই উদ্ধারকাজ থামাতে পারেনি। সাধারণত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাতের বেলায় হেলিকপ্টার চালানো অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক। তবুও বায়ুসেনার কর্মীরা ঝুঁকি নিয়েই অভিযান চালিয়ে গিয়েছেন। সুখনা দিঘি থেকে রাতেও জল তোলা এবং আগুন নেভানোর কাজ অব্যাহত থাকে।
এই ঘটনার পর আবারও প্রমাণ হল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ভারতীয় বায়ুসেনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু যুদ্ধ বা সীমান্ত রক্ষা নয়, দেশের সাধারণ মানুষের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বায়ুসেনার ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে দাবানলের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও এখন এমন আগুনের ঘটনা আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে বনাঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত সতর্কতা জারি করা অত্যন্ত জরুরি।
কসৌলির এই ভয়াবহ দাবানল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনও প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। কারণ পাহাড়ি এলাকায় সামান্য বাতাসও আবার আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। তবে ভারতীয় বায়ুসেনার দ্রুত পদক্ষেপ এবং বিরামহীন প্রচেষ্টায় বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রকৃতির এই ভয়ংকর রূপের সামনে দাঁড়িয়ে আবারও বোঝা গেল, প্রযুক্তি, সাহস এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত একসঙ্গে কাজ করলে বড় বিপদও অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব।


