ভারত প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত চলাকালে নিহত ছয় সেনাসদস্যের পরিচয়। ২০২৫ সালের মে মাসে পরিচালিত ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ প্রাণ হারানো এই সেনাদের নাম এখন ভারতের জাতীয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অভিযান নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এবার সরকারিভাবে নিহতদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহত ছয় সেনাসদস্যের নাম রাজধানী নয়াদিল্লির ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালের ‘ত্যাগ চক্র’-এ খোদাই করা হবে। এটি দেশের জন্য আত্মত্যাগকারী সেনাসদস্যদের প্রতি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের অন্যতম প্রতীক।
সরকারি তালিকা অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে পাঁচজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য এবং একজন ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ২০২৫ সালে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে নিহত সেনাদের বার্ষিক সম্মাননা তালিকার অংশ হিসেবেই তাঁদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারি তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁরা হলেন—
- সুবেদার মেজর পবন কুমার
- রাইফেলম্যান সুনীল কুমার
- ল্যান্স নায়েক দিনেশ কুমার
- অগ্নিবীর মুরালি নায়েক
- হাবিলদার সুনীল কুমার সিং
- সার্জেন্ট সুরেন্দ্র কুমার (ভারতীয় বিমানবাহিনী)
এই ছয়জনই ২০২৫ সালের মে মাসে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান।
২০২৫ সালের মে মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারতের দাবি, ওই হামলার পেছনে সীমান্তপারের জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মে ভারত পাকিস্তান এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কথিত জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান ও সামরিক হামলা চালায়। এই অভিযানের কোডনেম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’।
ভারত জানায়, অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকানো।
ভারতের হামলার পরপরই পাকিস্তান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। দুই দেশের মধ্যে বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং সীমান্তজুড়ে ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রায় চার দিন ধরে চলা এই সংঘাত ১০ মে শেষ হয়। এই সময় উভয় দেশই নিজেদের অবস্থানকে সফল বলে দাবি করলেও পরস্পরের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে।
ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা নেতৃত্ব জানিয়েছিল, পুরো সংঘাতের সময় ভারত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের এসব দাবি অতিরঞ্জিত বলে উল্লেখ করে।
এই সামরিক অভিযানের নামকরণ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ‘সিঁদুর’ শব্দটি সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিবাহিত নারীদের সিঁথিতে ব্যবহৃত লাল সিঁদুরকে নির্দেশ করে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পেহেলগাম হামলায় নিহত পুরুষদের স্ত্রীদের শোক ও ক্ষতির প্রতীকী প্রতিফলন হিসেবেই অভিযানের নাম রাখা হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। তাঁদের মতে, এটি ছিল সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় একটি প্রতীকী বার্তা বহনকারী নাম।
নিহত ছয় সেনাসদস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের মাধ্যমে ভারত শুধু তাঁদের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিল না, একই সঙ্গে অপারেশন সিঁদুরের ইতিহাসও আরও স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত করল।
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। সীমান্ত সংঘর্ষ, সন্ত্রাসবাদ এবং কাশ্মীর ইস্যু দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার জটিল করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে অপারেশন সিঁদুর এবং এতে নিহত সেনাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা


