আইপিএলের মঞ্চে নতুন এক বিস্ফোরক ব্যাটারের উত্থান দেখছে ক্রিকেট বিশ্ব। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই নিজের ব্যাটিং ঝড়ে আলো কেড়ে নিয়েছেন বৈভব সূর্যবংশী। এবার তাঁর কীর্তিকে স্বীকৃতি দিলেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ঙ্কর ব্যাটার ক্রিস গেল নিজেই। আইপিএলে গেলের দীর্ঘদিনের ছক্কার রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার পর বৈভবকে নতুন নামও দিয়েছেন ‘ইউনিভার্স বস’।
সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী ইনিংস খেলতে নেমে বৈভব সূর্যবংশী এমন এক নজির গড়েছেন, যা এতদিন শুধুই ক্রিস গেলের দখলে ছিল। এক মরসুমে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার আইপিএল রেকর্ড এখন বৈভবের নামে। বর্তমানে তাঁর মোট ছক্কার সংখ্যা ৬৫। এর আগে ২০১২ সালে ৫৯টি ছক্কা মেরে রেকর্ড গড়েছিলেন ক্রিস গেল। সেই রেকর্ড অবশেষে ভেঙে দিল রাজস্থানের তরুণ ব্যাটার।
বৈভবের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। তবে সবচেয়ে বড় প্রশংসা এসেছে সেই ক্রিকেটারের কাছ থেকেই, যার রেকর্ড ভেঙেছেন তিনি। ম্যাচের পর সমাজমাধ্যমে বৈভবকে নিয়ে পোস্ট করেন ক্রিস গেল। সেখানে তিনি লেখেন, “বৈভব অসাধারণ একজন ক্রিকেটার। তোমার ব্যাটিং দেখতে সত্যিই দারুণ লাগে।” শুধু প্রশংসাই নয়, বৈভবকে তিনি নতুন নামও দিয়েছেন — “নিউ সিক্স মেশিন”। অর্থাৎ নতুন যুগের ছক্কা মারার মেশিন হিসেবেই বৈভবকে দেখছেন গেল।
ক্রিস গেল নিজে ক্রিকেট বিশ্বে পরিচিত ‘ইউনিভার্স বস’ নামে। তাঁর মতো বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের জন্যই এই তকমা পেয়েছিলেন তিনি। এখন সেই ধারার উত্তরসূরি হিসেবেই উঠে আসছেন বৈভব সূর্যবংশী। সম্প্রচারকারী চ্যানেলও তাঁকে নতুন উপাধি দিয়েছে — “ইউনিভার্সাল বেবি বস”। বয়সে কিশোর হলেও মাঠে তাঁর আত্মবিশ্বাস ও মারকুটে ব্যাটিং অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকেও অবাক করছে।
বুধবারের ম্যাচে আরও একটি বড় রেকর্ড ভাঙার খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন বৈভব। ২০১৩ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে মাত্র ৩০ বলে শতরান করেছিলেন ক্রিস গেল। সেটি এখনও আইপিএলের দ্রুততম শতরানের অন্যতম রেকর্ড। সেই রেকর্ডও প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিলেন বৈভব। মাত্র ২৮ বলেই তিনি পৌঁছে যান ৯৭ রানে। তখন মনে হচ্ছিল, গেলের আরেকটি ঐতিহাসিক রেকর্ডও হয়তো ভেঙে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরের বলেই ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হন তিনি। ফলে অল্পের জন্য রক্ষা পায় গেলের দ্রুততম শতরানের রেকর্ড।
তবে বৈভবের ব্যাটিং দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও বহু রেকর্ড তাঁর ব্যাট থেকে আসতে চলেছে। আগ্রাসী মানসিকতা, নির্ভীক শট নির্বাচন এবং বোলারদের উপর চাপ তৈরি করার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। এত অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক মানের আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে ইতিমধ্যেই ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছেন তিনি।
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে বৈভব জানান, তিনি আদৌ জানতেন না যে ক্রিস গেলের রেকর্ড ভেঙে ফেলেছেন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল দ্রুত রান তুলে দলকে শক্ত জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। বৈভব বলেন, “ম্যাচ শেষ হওয়ার পরে জানতে পারি রেকর্ডের কথা। আমার লক্ষ্য ছিল ছক্কা মারা এবং দলের জন্য যত দ্রুত সম্ভব রান করা। আমি শুধু বল দেখেছি আর শট খেলেছি। বোলারদের উপর চাপ তৈরি করতে চেয়েছিলাম, আর সেটাই কাজে দিয়েছে।”
এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, রেকর্ডের চেয়ে দলের প্রয়োজনকেই বেশি গুরুত্ব দেন বৈভব। ক্রিকেটবিশ্বে বড় খেলোয়াড়দের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল এই মানসিকতা। আর সেই কারণেই অনেকেই এখন থেকেই তাঁকে ভবিষ্যতের সুপারস্টার হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
আইপিএলের চলতি মরসুমে এখনও অন্তত একটি ম্যাচ বাকি রয়েছে রাজস্থানের। গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে আবারও মাঠে নামবেন বৈভব সূর্যবংশী। ফলে তাঁর ছক্কার সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখ এখন সেই ম্যাচের দিকেই। কারণ প্রতিটি ইনিংসেই যেন নতুন ইতিহাস লিখছেন এই তরুণ ব্যাটার।
ভারতীয় ক্রিকেটে বহু প্রতিভাবান ব্যাটারের আগমন ঘটেছে। কিন্তু এত কম বয়সে আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে এমন ভয়ঙ্কর ব্যাটিং খুব কমই দেখা গেছে। বৈভব সূর্যবংশীর এই উত্থান তাই শুধু একটি রেকর্ড ভাঙার গল্প নয়, বরং ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন এক সুপারস্টারের জন্মের ইঙ্গিত।
ক্রিস গেলের মতো কিংবদন্তির প্রশংসা পাওয়া যে কোনও তরুণ ক্রিকেটারের কাছেই বিশাল সম্মানের। আর সেই সম্মান অর্জন করে বৈভব বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর পথচলা সবে শুরু। সামনে হয়তো আরও অনেক রেকর্ড, আরও অনেক বিস্ফোরক ইনিংস অপেক্ষা করছে ক্রিকেট বিশ্বের নতুন “সিক্স মেশিন”-এর জন্য।


