বিশ্বজুড়ে আবারও আলোচনায় এসেছে “এল নিনো”—একটা নাম, কিন্তু এর প্রভাব ভয়ঙ্কর। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা এবার এমন মাত্রায় পৌঁছাতে পারে, যা অতীতে কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, ইতিহাস কিন্তু এমনটাই বলছে।
এল নিনো কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
সহজভাবে বললে, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা। সাধারণত সমুদ্রের পানি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় থাকে, কিন্তু যখন সেটা হঠাৎ বেশি গরম হয়ে যায়, তখন পুরো পৃথিবীর আবহাওয়া ব্যবস্থায় পরিবর্তন শুরু হয়।
ধরো, তুমি একটা ফ্যান চালু করেছো—হঠাৎ সেটা দিক বদলে অন্যদিকে বাতাস দিতে শুরু করল। ঠিক তেমনই, এল নিনো পৃথিবীর আবহাওয়ার “বাতাসের দিক” বদলে দেয়।
এখনকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ?
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, এল নিনো ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়ে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ০.৯°F বেশি হয়েছে—যা এই ঘটনার শুরু হিসেবে ধরা হয়।
কিন্তু এখানেই শেষ না।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বছরের শেষ দিকে এটি “সুপার এল নিনো” বা “গডজিলা এল নিনো”-তে রূপ নিতে পারে। এর মানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩.৬°F বা তার বেশি বেড়ে যেতে পারে—যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এটি “খুব শক্তিশালী” হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় ৬৩%।
ইতিহাসের ভয়াবহ এল নিনো: ১৮৭৭ সালের ঘটনা
এবার একটু পিছনে ফিরে যাই।
১৮৭৭ সালে এক শক্তিশালী এল নিনো পৃথিবীজুড়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সেই সময় ভয়াবহ খরা, ফসল নষ্ট হওয়া, এবং খাদ্যের অভাবে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়।
ভাবতে পারো? তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল অনেক কম। আজকের দিনে এমন ঘটনা ঘটলে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকশো মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কোথায় কী হয়েছিল?
সেই সময় আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। বন আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে বর্ষা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। চীনের উত্তরে ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়।
ব্রাজিলে নদী শুকিয়ে যায়, কৃষি ব্যবস্থা ধসে পড়ে।
এগুলো শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না—এর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক রোগ।
রোগের প্রাদুর্ভাব: একের পর এক বিপর্যয়
খাদ্যের অভাব আর দুর্বল শরীর—এই সুযোগে ছড়িয়ে পড়ে নানা রোগ:
ম্যালেরিয়া
প্লেগ
ডায়াসেন্ট্রি
গুটি বসন্ত
কলেরা
এই রোগগুলো একসঙ্গে আঘাত হানায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। অনেক গবেষক মনে করেন, তখনকার প্রায় ৪% মানুষ মারা গিয়েছিল—যা আজকের হিসেবে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মানুষের সমান।
বর্তমান এল নিনো কী প্রভাব ফেলতে পারে?
প্রতিটি এল নিনো আলাদা। তবে কিছু সাধারণ প্রভাব দেখা যায়:
উত্তর আমেরিকায় উত্তরাঞ্চলে বেশি গরম পড়ে
দক্ষিণে তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে
ক্যালিফোর্নিয়া ও দক্ষিণাঞ্চলে বেশি বৃষ্টি হয়
অন্যদিকে কিছু জায়গায় খরা বাড়ে
এল নিনো আসলে ঝড়ের গতিপথও বদলে দেয়। ফলে কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও আবার দীর্ঘ খরা দেখা দেয়।
জেট স্ট্রিমের পরিবর্তন: বড় প্রভাবের কারণ
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “জেট স্ট্রিম”—যেটা আকাশের ওপর দিয়ে বাতাসের শক্তিশালী প্রবাহ।
এল নিনো যখন প্রশান্ত মহাসাগর গরম করে, তখন এই জেট স্ট্রিম দক্ষিণে নেমে যায়। ফলে:
দক্ষিণ অঞ্চলে বেশি বৃষ্টি
মধ্য অঞ্চলে খরা
উত্তর-পশ্চিমে বেশি গরম
এই পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে বড় দুর্যোগে পরিণত হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৮৭০-এর মতো একাধিক বছরের খরা আবারও ঘটতে পারে। তবে এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
কারণ এখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্র আগের চেয়ে অনেক বেশি গরম।
মানে, একই ঘটনা হলেও তার প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
হারিকেন ও এল নিনো: একটু স্বস্তির দিক
একটা মজার বিষয় আছে।
এল নিনো থাকলে সাধারণত আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন কম হয়। কারণ এটি ঝড়ের গঠনকে কিছুটা বাধা দেয়।
তাই ধারণা করা হচ্ছে, এবারের হারিকেন মৌসুম তুলনামূলক শান্ত হতে পারে।
কিন্তু এর মানে এই না যে কোনো ঝড় হবে না।
“একটা ঝড়ই যথেষ্ট”—বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ যেন ভুলেও ভাবছে না যে সবকিছু নিরাপদ।
কারণ ইতিহাস দেখায়—একটা বড় ঝড়ই সবকিছু বদলে দিতে পারে।
১৯৯২ সালের হারিকেন অ্যান্ড্রু ছিল এল নিনোর সময়েই, যা ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে এনেছিল।
তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
আমাদের জন্য কী শিক্ষা?
এই পুরো বিষয়টা শুনে মনে হতে পারে—এটা তো অনেক দূরের ঘটনা। কিন্তু আসলে তা নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে এক দেশের ঘটনা পুরো পৃথিবীকে প্রভাবিত করতে পারে।
ধরো, কোথাও ফসল নষ্ট হলো—তার প্রভাব খাবারের দামে এসে পড়ে তোমার আমার জীবনেও।
শেষ কথা
এল নিনো কোনো নতুন ঘটনা না। কিন্তু এখনকার পৃথিবীতে এর প্রভাব অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে।
ইতিহাস আমাদের আগেই সতর্ক করেছে। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই সতর্কবার্তা শুনছি?
সময় আছে, কিন্তু খুব বেশি না।


