ইউরোপজুড়ে চলমান রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো বলছে, তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা।
রোববার ও সোমবার—এই দুই দিনে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির জরুরি বিভাগ নিশ্চিত করেছে, নিহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের সাম্প্রতিক আবহাওয়া পরিস্থিতি গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ। তাপমাত্রার দ্রুত বৃদ্ধি এবং গরম বাতাসের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বোর্দেওক্সে গত দুই দিনে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। শহরটির ইতিহাসে এর আগে কখনও এত উচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়নি।
চরম গরমের কারণে সেখানে তিনজন প্রবীণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বয়স ছিল ৮০ থেকে ৯৫ বছরের মধ্যে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবীণদের শরীর অতিরিক্ত তাপ সহ্য করতে না পারায় তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কার্পেন্ত্রাস এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে একটি গাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গরম আবহাওয়ায় পার্ক করা গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। ফলে শিশুদের কখনও গাড়ির ভেতরে একা রেখে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মোট ১৮ জনের মধ্যে বাকি ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। তীব্র গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে হাজার হাজার মানুষ নদী, হ্রদ এবং সমুদ্রসৈকতে ভিড় করছেন।
ফ্রান্সের বেসামরিক নিরাপত্তা পরিষেবার মুখপাত্র জেরোম বওল্যাঙ্গার জানিয়েছেন, অনেকে নিরাপত্তাহীন ও নজরদারিবিহীন জলাশয়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তিনি সাধারণ মানুষকে শুধুমাত্র অনুমোদিত ও পর্যবেক্ষণাধীন স্থানে সাঁতার কাটার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাপপ্রবাহের প্রভাব মোকাবিলায় ফ্রান্স সরকার বিভিন্ন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অনেক এলাকায় দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়িয়ে ক্লাস পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত পানি পান এবং রোদ থেকে সুরক্ষিত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শুধু ফ্রান্স নয়, গোটা ইউরোপই বর্তমানে অস্বাভাবিক গরমের মুখোমুখি। জুন মাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় স্যান সেবাস্টিয়ান অঞ্চল সাধারণত শীতল আবহাওয়ার জন্য পরিচিত। কিন্তু এবার সেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এটি স্থানীয়দের জন্য এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
সাধারণত গ্রীষ্মকালেও এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। ফলে হঠাৎ এমন তাপমাত্রা বৃদ্ধি স্থানীয় বাসিন্দা ও আবহাওয়াবিদদের বিস্মিত করেছে।
যুক্তরাজ্যও বর্তমানে ভয়াবহ গরমের কবলে রয়েছে। দেশটিতে আগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল ১৯৫৭ এবং ১৯৭৬ সালে, যখন পারদ ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল।
তবে চলতি জুনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। এমন তাপমাত্রা যুক্তরাজ্যের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হচ্ছে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ু গবেষক Claire Barnes জানিয়েছেন, বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতির পেছনে ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া কাজ করছে।
এই প্রক্রিয়ায় উত্তর আফ্রিকা ও সাহারা মরুভূমি থেকে অত্যন্ত উষ্ণ বাতাস ইউরোপের দিকে প্রবাহিত হয়। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের উচ্চচাপ বলয় দীর্ঘ সময় ধরে স্থির থাকায় শীতল বাতাস প্রবেশ করতে পারে না।
ফলে তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে দাবদাহ অব্যাহত থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের তাপপ্রবাহ এখন আরও ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বর্তমানে ইউরোপে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে তাপপ্রবাহ, খরা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়বে।
ফ্রান্স, স্পেন এবং যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা জোরদার না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও মারাত্মক হতে পারে।
ফ্রান্সে মাত্র দুই দিনে ১৮ জনের মৃত্যু ইউরোপের চলমান তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা এবং শিশু ও প্রবীণদের ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। একই সঙ্গে স্পেন ও যুক্তরাজ্যেও অস্বাভাবিক গরম জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স


