২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং এশিয়ার শক্তিশালী দল জাপান। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিলেও প্রথমার্ধের শেষে এগিয়ে যায় জাপান। কাইশু সানোর অসাধারণ একক নৈপুণ্যে করা গোলে চাপে পড়ে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল।
বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামা সেলেসাওদের জন্য এটি ছিল বড় এক পরীক্ষা, আর জাপান শুরু থেকেই প্রমাণ করেছে তারা শুধুই অংশ নিতে আসেনি—ইতিহাস গড়তেই এসেছে।
গ্রুপ পর্বে শুরুটা কিছুটা ধীরগতির হলেও শেষ পর্যন্ত দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় ব্রাজিল। শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট নিশ্চিত করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়ররা।
সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই জাপানের বিপক্ষে মাঠে নামে তারা। কিন্তু শুরু থেকেই জাপানের হাই-প্রেসিং কৌশল ব্রাজিলের ছন্দ নষ্ট করে দেয়।
ম্যাচের শুরুতে বলের দখল ছিল প্রায় পুরোপুরি ব্রাজিলের। একপর্যায়ে তাদের দখল ছিল ৮২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে বলের দখল থাকলেও কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি তারা।
ব্রুনো গিমারায়েসের শট প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ব্লক করেন। দানিলো ডান প্রান্ত দিয়ে কয়েকটি ভালো আক্রমণ গড়লেও জাপানের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ করে দেয়।
অন্যদিকে গোলরক্ষক জিয়ন সুজুকি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। লুকাস পাকেতার ফ্রি-কিক সামলে নেওয়া থেকে শুরু করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের বিপজ্জনক রান—সবকিছুই দারুণ দক্ষতায় মোকাবিলা করেন তিনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই জাপান উচ্চগতির প্রেসিং ফুটবল খেলতে থাকে। ব্রাজিলের মিডফিল্ডে কোনো খেলোয়াড়কেই স্বাভাবিকভাবে বল ধরে রাখার সুযোগ দেয়নি তারা।
প্রতিটি পাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে জাপানি ফুটবলাররা ব্রাজিলকে বারবার ভুল করতে বাধ্য করেন। ফলে ব্রাজিলের আক্রমণগুলো মাঝমাঠেই থেমে যায়।
ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে প্রথমার্ধে। কাইশু সানো মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাই এগিয়ে যান। পথে সহজেই কাটিয়ে দেন কাসেমিরোকে, এরপর ঠাণ্ডা মাথায় গোলরক্ষক অ্যালিসনের পাশ দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে জাপানকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
এটি ছিল নিখুঁত ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের এক অসাধারণ উদাহরণ। একই সঙ্গে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই ম্যাচে সবচেয়ে সমালোচিত ফুটবলার ছিলেন কাসেমিরো। সানোর গোলের সময় তিনি প্রতিপক্ষকে থামাতে ব্যর্থ হন। পরে আরও কয়েকবার বল হারিয়ে জাপানের পাল্টা আক্রমণের সুযোগ তৈরি করে দেন।
তার ধীরগতি এবং ভুল সিদ্ধান্ত ব্রাজিলের জন্য বড় সমস্যায় পরিণত হয়। অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডারের কাছ থেকে এমন পারফরম্যান্স মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না।
প্রথমার্ধ শেষে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল। বিরতির সময়ই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
ইনজুরির কারণে লুকাস পাকেতাকে তুলে এনে তরুণ ফরোয়ার্ড এন্দ্রিককে মাঠে নামানো হয়। স্পষ্টতই আক্রমণভাগ আরও শক্তিশালী করতেই এই সিদ্ধান্ত নেন ইতালীয় কোচ।
এখন প্রশ্ন ছিল—এই পরিবর্তন কি ম্যাচে ব্রাজিলকে ফিরিয়ে আনতে পারবে?
জাপানের রক্ষণভাগ পুরো ম্যাচজুড়েই ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ। ব্রাজিল যতবারই আক্রমণে উঠেছে, ততবারই সংগঠিত ডিফেন্স দিয়ে তাদের থামিয়ে দিয়েছে।
জিয়ন সুজুকির আত্মবিশ্বাসী গোলকিপিং এবং ডিফেন্ডারদের নিখুঁত অবস্থান ব্রাজিলকে বড় কোনো সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি।
স্টেডিয়ামের বেশিরভাগ দর্শকই ব্রাজিলের সমর্থক হলেও প্রথমার্ধ শেষে তাদের মুখে ছিল হতাশার ছাপ।
দলের নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সে গ্যালারির উচ্ছ্বাস দ্রুতই স্তব্ধ হয়ে যায়। আক্রমণে ধার না থাকায় সমর্থকদের মধ্যে স্পষ্ট উদ্বেগ দেখা যায়।
প্রথমার্ধের পারফরম্যান্স দেখে মনে হয়েছে জাপান কেবল রক্ষণ সামলাতেই নয়, সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে গোল করার ক্ষমতাও রাখে।
অন্যদিকে ব্রাজিলকে ম্যাচে ফিরতে হলে আরও দ্রুতগতির ফুটবল খেলতে হবে, মাঝমাঠে সৃজনশীলতা বাড়াতে হবে এবং গোলের সামনে সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ব্রুনো গিমারায়েস এবং এন্দ্রিকের ওপরই এখন নির্ভর করছে সেলেসাওদের ভাগ্য।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জাপান আবারও প্রমাণ করেছে তারা আর শুধুমাত্র আন্ডারডগ নয়, বড় দলগুলোর জন্য বাস্তব হুমকি। কাইশু সানোর দুর্দান্ত গোলে প্রথমার্ধ শেষে এগিয়ে থেকে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে তারা।
অন্যদিকে ব্রাজিলের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে ফিরতে হবে আনচেলত্তির দলকে। ম্যাচের বাকি সময়ে কী ঘটে, সেটাই এখন ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় কৌতূহল।


